
ক্রীড়া ডেস্ক : কিছুদিন আগেই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসির। সেই হতাশা কাটিয়ে ইন্টার মিয়ামির দলে ফিরেছিলেন ফুটবলের এই মহাতারকা। তবে এবার তার জীবনে নেমে এসেছে আরও বড় শোক। ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন মেসির বাবা হোর্হে মেসি।
বাবার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ এক আবেগঘন বার্তায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন মেসি। বাবার সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘বাবা, তোমার চলে যাওয়াটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। বাস্তবতাটা এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। আসলে আমি এটা মানতে চাইছি না। তোমাকে আর দেখতে পাব না, আমাদের আর কখনো কথা হবে না, এটা কল্পনা করাও আমার জন্য খুব কঠিন। আমি জানি তুমি কষ্টে ছিলে এবং এটাই তোমার জন্য হয়ত ভালো হয়েছে, কিন্তু তুমি খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলে। আমাদের একসঙ্গে আরও কত কিছু উপভোগ করার বাকি ছিল।’
বাবার অনুরোধেই উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলতে গিয়েছিলেন জানিয়ে মেসি লিখেছেন, ‘তুমি আমাকে শেষ বিশ্বকাপটা খেলার জন্য কত অনুরোধ করেছিলে! আর টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই তোমার শরীর সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়ে গেল। মা আমাকে বলছিলেন যে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং খেলা দেখতে আসার মতো ভালো হয়ে যাবে। আমিও তোমাকে বলতাম, আমরা ফাইনালে উঠবই যাতে তুমি আসার সুযোগ পাও।’
বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিটি ম্যাচের পর বাবার বার্তার অপেক্ষায় থাকার কথাও স্মরণ করেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি তোমার বার্তার অপেক্ষায় থাকতাম আর তোমাকে খুব মিস করতাম। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে পরিস্থিতি কতটা কঠিন ছিল। তা সত্ত্বেও, আমি শুধু যতটা সম্ভব দূর পর্যন্ত যাওয়ার কথা ভাবতাম, যাতে তোমাকে কিছুটা সময় দেওয়া যায় আর তুমি এসে অন্তত একটা ম্যাচ দেখতে পারো। আমরা ফাইনালে পৌঁছালাম, কিন্তু তুমি আসতে পারলে না। আমি কাপটা জিততে চেয়েছিলাম, যাতে তোমার কাছে নিয়ে গিয়ে নতুন একটা ট্রফি দেখাতে পারি। কিন্তু পারলাম না।’
বিশ্বকাপ শেষে বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়কার কথাও তুলে ধরেছেন মেসি। তার ভাষায়, ‘আমি যখন ফিরে এলাম, তুমি ভেবেছিলে আমরা পেনাল্টিতে ফাইনাল হেরে গেছি। যা কিছু ঘটেছিল, তা নিয়ে আমরা একটা কথাও বলতে পারলাম না। তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারলে না। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি ঠিকই, তবে আমরা প্রতিটি ম্যাচ কতটা উপভোগ করেছি তা তুমি জানতে পারলে না। আবারও তুমিই ঠিক প্রমাণিত হলে—আমার সেখানে যাওয়া এবং খেলাটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।’
বাবাকে হারানোর পর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অনিশ্চয়তার কথাও জানিয়েছেন মেসি। তিনি লিখেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করব জানি না, কীভাবে সামনে এগোবো বুঝতে পারছি না। আমি তো শুধু ফুটবলটাই খেলতে জানতাম, আর এখন আমার নিজের মনেই বড় সংশয় জাগছে যে আমি আর কতদিন খেলাটা চালিয়ে যেতে পারব। শুরু থেকেই তো তুমি আমার পাশে ছিলে, একদম শেষ মুহূর্তের তো আর অল্প একটু বাকি ছিল। আর কিছুটা সময় কেন ধৈর্য ধরে থাকলে না বাবা? তাহলে তো আমরা একসাথেই শেষটা করতে পারতাম!’
বাবাকে শুধু অভিভাবক নয়, নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রতিনিধি হিসেবেও দেখতেন মেসি। সেই সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তুমি একাধারে আমার বাবা, সেরা বন্ধু এবং প্রতিনিধি ছিলে। প্রতিটি মুহূর্তে যেভাবে পাশে থাকা দরকার, তুমি ঠিক সেভাবেই থাকতে—কখনো কোনো ভুল করোনি। টুকটাক অভিমান বা ঝগড়া সত্ত্বেও দিনশেষে সবসময় তুমিই ঠিক প্রমাণিত হতে। সবশেষে তুমি যেভাবে বলতে, ঠিক সেটাই ঘটত।’
বাবার স্মৃতি আজীবন নিজের ও পরিবারের সঙ্গে থাকবে জানিয়ে মেসি লিখেছেন, ‘তোমাকে অনেক অনেক মিস করব বাবা, তবে তুমি সবসময় আমাদের মাঝে থাকবে। তোমরা আমাকে যেভাবে বড় করেছ, আমিও আমার সন্তানদের সেভাবেই শিক্ষা দিচ্ছি। শান্তিতে ঘুমাও বাবা, আর ওপর থেকে আমাদের সেভাবেই আগলে রেখো, যেমনটা এখানে থাকতে করতে। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’
সবশেষে বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে মেসি লিখেছেন, ‘তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বাবা।’
