
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পেশাদারদের যোগাযোগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইন ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে গুপ্তচরবৃত্তি চালানোর অভিযোগ উঠেছে চীনের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক সদস্য, শিক্ষাবিদসহ স্পর্শকাতর তথ্যের নাগাল রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এ তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে লক্ষ্য ব্যক্তিদের পেশাগত পরিচয় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রেখে বার্তা তৈরি করছেন চীনা গোয়েন্দারা।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩ জুন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সমন্বয়ে গঠিত গোয়েন্দা জোট ‘ফাইভ আইজ’ এক যৌথ সতর্কবার্তায় চীনের এ তৎপরতার কথা জানায়। জোটটির ভাষ্য, চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের (এমএসএস) কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিংকডইনসহ বিভিন্ন পেশাদার নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্য ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
চীনা গোয়েন্দারা কখনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়োগদাতা, আবার কখনো ব্যবসায়িক পরামর্শক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন। সহজে অর্থ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লক্ষ্য ব্যক্তিদের পেশাগত বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি বা পরামর্শ দেওয়ার কাজ দেওয়া হচ্ছে। পরে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে সংবেদনশীল তথ্য ও গোপন নথি সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এআই দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য ফাঁদ
গোয়েন্দা তৎপরতায় ভুয়া পরিচয় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে এআই দিয়ে তৈরি ছবি, পেশাদার বার্তা ও নকল প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। লক্ষ্য ব্যক্তির কর্মক্ষেত্র, অভিজ্ঞতা ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে তাঁদের উপযোগী বার্তা পাঠানো হয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁরা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মীদের মধ্যে লিংকডইনের ব্যবহার বেশি হওয়ায় প্ল্যাটফর্মটি গোয়েন্দাদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। পেশাগত পরিচয় ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্ভাব্য লক্ষ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করাও এখানে তুলনামূলক সহজ।
লিংকডইন ব্যবহার করে চীনের গুপ্তচর নিয়োগের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। অন্তত ২০১১ সাল থেকে এ ধরনের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টারইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সেন্টারের তৎকালীন প্রধান উইলিয়াম ইভানিনা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে লিংকডইন কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সময় প্ল্যাটফর্মটি কয়েক ডজন ভুয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ করলেও এ ধরনের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এফবিআইয়ের অভিযানে ১৩টি ডোমেইন জব্দ
চীনের কথিত অনলাইন গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোও পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ১০ জুন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই চীনা গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ১৩টি ওয়েব ডোমেইন জব্দ করে। এসব ওয়েবসাইটে ভুয়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করা হতো।
এফবিআইয়ের নথি অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্তত আটজন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৩টি ডোমেইন জব্দ করা চীনের বিস্তৃত অনলাইন গুপ্তচরবৃত্তির তুলনায় সীমিত পদক্ষেপ।
ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের গবেষকেরা ইতিমধ্যে শতাধিক ওয়েব ডোমেইন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো চীনা গুপ্তচর নিয়োগের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরোধে প্রযুক্তি ও তথ্য বিনিময়ের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলায় মার্কিন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং তথ্য বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন। সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া অ্যাকাউন্টের তথ্য দ্রুত বিনিময় করা গেলে সেগুলো শনাক্ত ও বন্ধ করা সহজ হবে।
এ ক্ষেত্রে এআইকে প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। অনলাইন প্রতারণামূলক বার্তা শনাক্তে ব্যবহৃত প্রযুক্তি লিংকডইনের বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থায় যুক্ত করে সম্ভাব্য গুপ্তচর নিয়োগের চেষ্টা শনাক্ত করা এবং ব্যবহারকারীদের সতর্ক করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ ও নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের তুলনায় সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য সতর্কবার্তা অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই লিংকডইনসহ পেশাদার যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য গুপ্তচর নিয়োগের কৌশল সম্পর্কে নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রচারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সন্দেহজনক বার্তা দ্রুত জানানোর জন্য সহজ রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে ব্যবহারকারীরা সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তির চেষ্টা সম্পর্কে প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়ও সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের অনলাইন গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এআইভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের তৎপরতা ব্যাহত করা সম্ভব।
