বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের বিদ্যুৎখাতে একসময় সম্ভাবনাময় ও সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছিল। কিন্তু বর্তমানে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

১৯৯৪ সালে দেশের বিদ্যুৎ সংকট কমানোর লক্ষ্য নিয়ে আরপিসিএল যাত্রা শুরু করে। শুরুতে নানা সমস্যার মধ্যে থাকলেও পরে দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ায়। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ, গাজীপুরের কড্ডা এবং চট্টগ্রামের রাউজানে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে আরপিসিএল নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে। গাজীপুরে ৫২ ও ১০৫ মেগাওয়াট এবং রাউজানে ২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প চালু রয়েছে। পাশাপাশি শম্ভুগঞ্জে ২১০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে আরও ৩৬০ মেগাওয়াটের নতুন প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে কাজের ধীরগতি ও তদারকির অভাবে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে চালু হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

জামালপুরে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অব্যবস্থাপনা, গাফিলতি এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে কাজ এগোচ্ছে না। এতে সরকারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে।

অভিযোগ রয়েছে, আরপিসিএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে গতি কমে গেছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার অভাব, নিয়মিত মনিটরিং না করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে উদাসীনতার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, অফিসের প্রয়োজনীয় কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্যস্ততাতেই বেশি সময় যাচ্ছে। ফলে বড় বড় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে, কাজের অগ্রগতি কমেছে এবং প্রশাসনিক পরিবেশও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চীনের নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল ও আরপিসিএলের যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাতেও আগের মতো গতি নেই। এই প্রকল্পটি আরএনপিএল নামে পরিচালিত হয়, যেখানে ব্যবস্থাপনা দায়িত্বেও রয়েছেন এএইচএম রাশেদ। একইভাবে আরপিসিএল ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ মালিকানাধীন বি-আর পাওয়ারজেনের কয়েকটি প্রকল্পেও প্রভাব পড়েছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীর খিলক্ষেতে শতকোটি টাকা ব্যয়ে আরপিসিএলের নিজস্ব ভবন কেনা হয় আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে। উত্তারাতেও প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি ভবন রয়েছে। কিন্তু এত সম্পদ ও অবকাঠামো থাকার পরও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় প্রতিষ্ঠানকে সফল রাখতে প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা। এসব জায়গায় দুর্বলতা তৈরি হলে প্রতিষ্ঠান যত বড়ই হোক, সংকটে পড়তে সময় লাগে না। আরপিসিএল এখন সেই বাস্তবতার মধ্যেই আছে বলে মনে করছেন অনেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *