
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল আলোচিত এই বাক্যটি এখনো মানুষের মুখে মুখে। ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মিরপুর কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন উপপরিচালক প্রকৌশলী মাসুদ আলমকে উদ্দেশ করে এই মন্তব্য করেছিলেন।
সেই সময় বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত ছিল। ওবায়দুল কাদেরের কঠোর মন্তব্যের পরও প্রশ্ন উঠেছে—সেই মাসুদ আলম কতটা পরিবর্তিত হয়েছেন ? একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিআরটিএর বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রকৌশলী মাসুদ আলমের কার্যালয়েও ঘুষ, দালালনির্ভর সেবা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিআরটিএ: দালাল ছাড়া ‘অসম্ভব’ সেবা ?
চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, মূল কার্যালয়ের বাইরে দালালদের সক্রিয় উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। কার্যালয়ের বাম পাশে দেয়ালঘেঁষা মার্কেট এবং উত্তর পাশের দোকানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শতাধিক দালাল বিভিন্ন আবেদনপত্র প্রস্তুত করে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান। ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কাজে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আবদুস ছামাদ, ফোরকান-১, ফোরকান-২, মোহাম্মদ ইছা ও খোরশেদসহ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে দালাল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এমরান, শহিদ, দিদার, মিনার, আক্তার ও রাজাসহ কয়েকজন দোকানদারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
এক সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেন, বিআরটিএর ক্যাজুয়াল স্টাফদের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের কাছে টাকা পৌঁছায়। দালালের মাধ্যমে দ্রুত কাজ হলেও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার হতে হয়। ফটিকছড়ির বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইমন জানান, আট মাস আগে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেও এখনো তিনি লাইসেন্স পাননি। পরীক্ষায় পাস করার পরও বারবার তাকে সার্ভার সমস্যা ও সময় লাগার কথা বলে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘
ভালো করার চেষ্টা করছি’: মাসুদ আলম : অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএর পরিচালক প্রকৌশলী মাসুদ আলম বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানকে ভালো করার চেষ্টা করছেন। তবে কার্যালয়ের বাইরে কেউ দালালি করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, বাইরে থেকে কেউ টাকা দিয়ে এলেও জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেকেই তা স্বীকার করেন না। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে কার্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ ও অনিয়মের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম বিআরটিএতে অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের দায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে মাসুদ আলমের ওপর বর্তায়।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অনলাইন সেবার কথা বলা হলেও বাস্তবে মানুষকে এখনো বিআরটিএ কার্যালয়ে যেতে হয়। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
বিআরটিসির মাসুদ তালুকদার: অভিযোগের পাহাড় : রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আরেক কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. মাসুদ তালুকদারের নাম।
বর্তমানে তিনি ঢাকা ট্রাক ডিপোর ইউনিট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিআরটিসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—নতুন বাস ও ট্রাক থেকে যন্ত্রাংশ পরিবর্তন, ইঞ্জিন বিক্রি করে পুরোনো ইঞ্জিন স্থাপন, মবিল ও পোড়া মবিল বিক্রি, শ্রমিকদের বেতন কর্তন, ট্রিপ চুরি, তেল ও টায়ার চুরি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের। অভিযোগকারীদের দাবি, তার সম্পদের বড় অংশ স্ত্রী, শ্বশুর ও ছোট ভাইয়ের নামে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে বহুতল ভবন, ঢাকার বাসাবো, ওয়ারী ও খিলক্ষেতে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচলের বিভিন্ন সেক্টরে প্লট থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া শেখ ফজলুল করীম সেলিম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-২ গাজি হাফিজুর রহমান লিকুর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাসুদ তালুকদার।
বিআরটিসিতে ‘মাসোহারা’ সিন্ডিকেটের অভিযোগ :
বিআরটিসিতে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—দেশের বিভিন্ন ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায়ের একটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ অনুযায়ী, ২২টি ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে মাসে প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘মাসোহারা’ আদায় করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লাকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটে পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন্স) মো. রাহেনুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম (ওয়ার্কস) মো. মনিরুজ্জামান মিয়া, জোয়ারসাহারা ডিপোর ইউনিট প্রধান মো. মফিজ উদ্দিন এবং গাবতলী ডিপোর ইউনিট প্রধান মো. নায়েব আলীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিপো প্রধান পদে বসানোর ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেন হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো থেকে ৩০ লাখ টাকা, ঢাকা ট্রাক ডিপো থেকে ২৫ লাখ টাকা, মতিঝিল ও রংপুর বাস ডিপো থেকে ১০ লাখ টাকা করে এবং জোয়ারসাহারা ডিপো থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বরিশাল ডিপো থেকেও মাসে প্রায় ৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে পদ? অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন :
বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ নথি ও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, অডিট আপত্তি ও বিভাগীয় অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মোশাররফ হোসেন সিদ্দিককে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ঢাকা ট্রাক ডিপোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া হত্যা মামলার আসামি হওয়ার অভিযোগ থাকা এনামুল হককে ময়মনসিংহ ডিপোর দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মাসুদ তালুকদারকে নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে যে, তার বিরুদ্ধে ১৭টি অভিযোগের মধ্যে ১২টি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বরখাস্তের আদেশ হয়েছিল। কিন্তু পরে শাস্তির পরিবর্তে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। মাসুদ তালুকদার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, আগের সময়ে রাজনৈতিক চাপের কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেননি।
তদন্তের মুখে বিআরটিসি :
বিআরটিসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা তদন্ত করছেন বলে জানা গেছে।
অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. জিন্নাত রেহানা জানিয়েছেন, বিআরটিসির অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুই প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা—একজন বিআরটিএর মাসুদ আলম, অন্যজন বিআরটিসির মাসুদ তালুকদার। একজনকে একসময় বলা হয়েছিল ‘ভালো হয়ে যেতে’, অন্যজনকে ঘিরে উঠেছে দুর্নীতির নানা অভিযোগ। অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে রাষ্ট্রীয় পরিবহন খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
