আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রচণ্ড দাবদাহ এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার অগ্নিনির্বাপণ কর্মী। ইতোমত্যেই আগুন থেকে বাঁচতে ইউরোপের একাধিক দেশের হাজার হাজার অধিবাসী ও পর্যটক নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশ্রয়স্থল ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লান্দেস বিভাগের লুগলোঁ শহরের আশপাশ থেকে নতুন করে অন্তত ১০০ জন বাসিন্দা ও পর্যটককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই আগুন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করছে। লান্দেস প্রসেফেকচার থেকে জানানো হয়েছে, আগুন ইতোমধ্যে প্রায় ১,৫৮০ হেক্টরেরও বেশি এলাকা ভস্মীভূত করেছে। বিশেষ করে লুগলোঁ শহরের দক্ষিণ-পূর্বাংশে গা রেঁ গ্রামের কাছাকাছি এলাকায় আগুন তীব্র রূপ ধারণ করেছে। ভয়াবহ এই আগুন নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে ৫৫০ জন ফায়ারফোর্সের কর্মী সমন্বিতভাবে কাজ করছেন এবং আকাশপথে আগুন নেভানোর মহড়া পুনরায় শুরু করা হয়েছে।

জার্মানির ইফেল অঞ্চলে দাবানলের প্রভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানে নর্থ রাইন-ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বনভূমি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। হুরটগেনওয়াল্ড এলাকা থেকে অন্তত ১,৮০০ জন মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ১,৪০টি বিভিন্ন ফায়ার ব্রিগেডের অগ্নিনির্বাপক দল দিনরাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ বেলজিয়ামের ফাগনেস প্রাকৃতিক উদ্যানে সৃষ্টি হওয়া অন্য একটি দাবানল নেভাতে জার্মান দমকল বাহিনীর সাহায্য চাওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই আগুনে বেলজিয়াম সীমান্তে অন্তত ১৬ বর্গকিলোমিটার বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আরাগন অঞ্চলেও পরিস্থিতি বেশ গুরুতর। সেখানে ১৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকা ছাই হয়ে গেছে এবং প্রায় এক হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা আগুনকে বসতি এলাকার দিকে এগোনো থেকে থামাতে সক্ষম হয়েছেন। পাশাপাশি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে যে ওই অঞ্চলে খুব শীঘ্রই তাপমাত্রা কমতে পারে এবং হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। গ্রীসেও তীব্র বাতাসের কারণে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৫০টিরও বেশি কৃষি ও বনভূমির দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, যদিও অধিকাংশ আগুন ফায়ার সার্ভিস দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতেও দাবানল পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার ডুগি ওটোক দ্বীপে ১০০ জনেরও বেশি অগ্নিনির্বাপক কর্মী এবং দুটি ওয়াটার বোম্বিং বিমানের সাহায্যে আগুন নেভানোর কাজ চলছে। এছাড়া পেলজেসাক উপদ্বীপে ছড়ানো আরেকটি আগুন শুক্রবার আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়েছে। সার্বিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে বেলগ্রেডের কাছে দেলিব্লাতস্কা জাতীয় উদ্যানে ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভস্মীভূত করা একটি বড় দাবানল সহ তারা প্রায় ২৫টি বনাঞ্চলের আগুনের সাথে লড়াই করছে।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন জানিয়েছেন যে সমগ্র ইউরোপ বর্তমানে উচ্চ দাবানল সতর্কতায় রয়েছে এবং পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কোপার্নিকাস’ উপগ্রহ ইতোমধ্যেই স্পেন, আলবেনিয়া, গ্রীস, ফ্রান্স, জার্মানি এবং সার্বিয়ায় মানচিত্র তৈরি ও জরুরি সহায়তায় কাজ শুরু করেছে। আক্রান্ত দেশগুলোকে জরুরি সহায়তা প্রদান করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজম সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *