ক্রীড়া ডেস্ক : ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর পর মনে হয়েছিল লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের বৃত্ত বুঝি পূর্ণ হয়ে গেছে। তবে ফুটবল মাঠে টিকে থাকার তাড়না যে মেসির এখনো ফুরিয়ে যায়নি, সেটা জাতীয় দলের হয়ে তার খেলা চালিয়ে যাওয়াই প্রমাণ করে। একইভাবে ফুরিয়ে যাননি তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও।

উত্তর আমেরিকার মাটিতে এ বছরের ফুটবল বিশ্বকাপে এক নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে প্রস্তুত হচ্ছেন এই দুই কিংবদন্তি। ফুটবল বিশ্বের দুই মহাতারকার জন্য এটিই হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শেষ লড়াই বা ‘লাস্ট ড্যান্স’।

দুই দশক আগে তরুণ হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া মেসি ও রোনালদো এবার ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ মঞ্চে পা রাখতে যাচ্ছেন। ফুটবল মাঠ ছাড়িয়ে যারা আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি তরুণের আইকন। মধ্যবয়সে পা রাখা এবং অবসরের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই তারকা ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা আকর্ষণ।

কাতার বিশ্বকাপের পর মেসি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তার আর পাওয়ার কিছু বাকি নেই। দোহার সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারানোর পর ফুটবল মাঠের এই ক্ষুদে জাদুকর বলেছিলেন, ‘অবশ্যই আমি আমার ক্যারিয়ারটা এভাবেই শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না। আমার ক্যারিয়ার শেষের দিকে চলে এসেছে, কারণ এগুলোই আমার শেষ বছর। এরপর আর কী-ই বা পাওয়ার থাকতে পারে?’

তবে ভাগ্য যেন তাদের জন্য আরও বড় কিছুর পরিকল্পনা করে রেখেছিল।

কাতারের সেই সাফল্যের সময় মেসি প্যারিস সেন্ট-জার্মেইতে (পিএসজি) কিছুটা কঠিন সময়ই পার করছিলেন। এর ছয় মাস পরেই তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে (এমএলএস)। ইন্টার মায়ামির হয়ে গত বছরই তিনি এমএলএস কাপের শিরোপাও জিতেছেন।

যদিও মেসি এখন আর ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে খেলছেন না, তবুও আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জন্য তিনি এখনও অপরিহার্য।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় তার নেতৃত্বেই চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও তিনি ছিলেন শীর্ষ গোলদাতা। সম্প্রতি মেসি পুনরায় জানিয়েছেন, ‘আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি এবং যতদিন পারব, ততদিন খেলে যাব।’

২০০ ম্যাচের মাইলফলক ও ক্লোসার রেকর্ডের হাতছানি 

২০০৬ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ গোলে জয়ের ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করেছিলেন মেসি।

যদিও দীর্ঘ সময় পর আবারও তার বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে মাঝে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছিল, তবে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সে যেন বিশ্বকাপে থাকে, তার জন্য আমি সবকিছু করব।’

বর্তমানে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচের মাইলফলক ছোঁয়া থেকে মাত্র দুটি ম্যাচ দূরে আছেন। পাশাপাশি ২০১৪ সালের রানার্সআপ হওয়াসহ বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত রেকর্ড ২৬টি ম্যাচ খেলার কীর্তি রয়েছে তার।

বিশ্বকাপে মেসির বর্তমান গোলসংখ্যা ১৩টি। আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষদের শক্তি বিবেচনা করলে মিরোস্লাভ ক্লোসার অল-টাইম রেকর্ড ১৬টি গোল ভেঙে দেওয়া তাই মেসির জন্য খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা নয়।

গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার প্রথম দুই প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে জর্ডানের মুখোমুখি হবে আলবিসেলেস্তেরা, যা অনুষ্ঠিত হবে মেসির ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক তিন দিন পর।

৪১ বছর বয়সেও অনড় রোনালদো 

বয়সের দিক থেকে মেসির চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রোনালদো। তবে ৪১ বছর বয়সি এই পর্তুগিজ মহাতারকা ক্যারিয়ারের শেষবেলায় বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর বলাই যায়।

২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে ঘরের মাঠে হেরে যখন গোটা পর্তুগাল অশ্রুসিক্ত, রোনালদো তখন এক কিশোর। ২০১৬ সালে সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে রোনালদোর নেতৃত্বেই পর্তুগাল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়।

তবে বিশ্বকাপের মঞ্চটি সিআরসেভেনের জন্য সবসময়ই কিছুটা কঠিন প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ করে ২০০৬ সালে পর্তুগাল সেমিফাইনালে ওঠার পর থেকে। এরপর থেকে পর্তুগাল বিশ্বকাপে মাত্র একটি নকআউট ম্যাচ জিততে পেরেছে। সেটাও ২০২২ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ৬-১ গোলের জয় পায় পর্তুগাল। ওই ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন না আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের মালিক এই পর্তুগিজ সুপারস্টার। এ নিয়ে অবশ্য তৎকালীন হেড কোচ ফার্নান্দো সান্তোসকে কম প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়নি। পরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলে কোচের দায়িত্ব থেকেও সরে যেতে হয় তাকে।

‘অনবদ্য প্রতিশ্রুতি’ 

২০২২ বিশ্বকাপের পর রবার্তো মার্টিনেজ পর্তুগালের কোচের দায়িত্ব নিয়ে রোনালদোকে আবারও দলের প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০২৪ সালের ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে পর্তুগাল বিদায় নিলেও এবং রোনালদো কোনো গোল করতে না পারলেও, কোচের ভরসা এখনও তার ওপরেই। ইতোমধ্যে মার্টিনেজের অধীনে ২০২৫ সালে নেশন্স লিগের শিরোপা জিতেছে পর্তুগাল। ওই ম্যাচে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন সিআরসেভেন।

২২৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে পুরুষ ফুটবলে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি বর্তমানে রোনালদোর দখলে। রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই সাবেক সুপারস্টার বর্তমানে আল নাসরের হয়ে সৌদি প্রো লিগের শিরোপা জয়ের একদম দ্বারপ্রান্তে।

সম্প্রতি রোনালদো নিশ্চিত করেছেন যে, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৪১ বছর হতে চলেছে এবং আমি মনে করি এটাই বিদায়ের সঠিক সময়।’

তিন দেশের আয়োজিত বিশ্বকাপে কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে লড়বে পর্তুগাল। দলে রোনালদোর উপস্থিতি নিয়ে পর্তুগালের প্রতিভাবান তরুণ স্কোয়াডে কিছু বিতর্কের গুঞ্জন শোনা গেলেও, তাদেরকে এবার বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গোলস্কোরার হিসেবেও ‘বুড়ো’ রোনালদোর এখনো বিকল্প খুঁজে পায়নি তারা।

আর ব্যক্তিগতভাবে রোনালদো বিশ্বকাপে তার বর্তমান ৮টি গোলের খাতা আরও বড় করতে এবং নকআউট পর্বে নিজের প্রথম গোলটি পেতেও যে মরিয়া হয়ে থাকবেন তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

পর্তুগিজ গণমাধ্যম আরটিপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোনালদোকে প্রশংসায় ভাসিয়ে পর্তুগাল কোচ মার্টিনেজ বলেছিলেন, ‘সে কেবল একজন ফুটবলারই নয়, জাতীয় দলের জন্য সে তার চেয়েও বেশি কিছু। সে দলের অধিনায়ক এবং দেশের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি অনবদ্য। সে সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য সবকিছুই জেতা হয়েছে ফুটবলের এই জীবন্ত কিংবদন্তির। বিশ্বকাপের শিরোপাই এখন কেবল বাকি আছে। তাই এই ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা রোনালদোর জন্য হবে রূপকথার মতো এক সমাপ্তি।

আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চের বিষয় হলো—আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল যদি নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তবে আগামী ১১ জুলাই কানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালেই মুখোমুখি হতে পারেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ফুটবল ভক্তরাও যে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মহারণ দেখার অপেক্ষাতেই দিন গুণছেন সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *