ডেস্ক নিউজঃ ভ্যাটিকানে আয়োজিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক যুদ্ধবিষয়ক ‘গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলি’তে অংশ নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনটি গত ১৬ জুলাই রোমের ক্যাপিটোলাইন হিলে ‘হিউম্যানিটি অ্যাট দ্য থ্রেশহোল্ড’ শীর্ষক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

এ সম্মেলনে রোমানো প্রোদি, জোডি উইলিয়ামস, মারিয়া রেসা, ডেনিস মুকওয়েগে এবং হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসসহ বিশ্বের বিভিন্ন নোবেলজয়ীর অংশগ্রহণে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ঘোষণাপত্রে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বয় মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য এক নজিরবিহীন হুমকি তৈরি করছে। এতে পারমাণবিক যুগের সূচনা এবং বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের মধ্যে সরাসরি তুলনা টেনে বলা হয়েছে, বিশ্ব এখন এমন এক এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে এগোচ্ছে, যা একই সঙ্গে চলমান পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে মানবজাতি আবারও ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে।

নোবেলজয়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই পারমাণবিক কমান্ড ব্যবস্থায় মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা দুর্বল করে দিচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সাইবার হুমকি বাড়াচ্ছে এবং তথ্যযুদ্ধকে এমনভাবে উৎসাহিত করছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় পারস্পরিক আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।

ভ্যাটিকানের কাস্তেল গানদোলফোতে অবস্থিত বর্গো লাউদাতো সি’তে আয়োজিত এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ইউনূস।

এ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বর্গো লাউদাতো সি’-এর সভাপতি কার্ডিনাল ফাবিও বাজ্জিও, ডিকাস্টারি ফর দ্য ইনস্টিটিউটস অব কনসেক্রেটেড লাইফ অ্যান্ড সোসাইটিজ অব অ্যাপোস্টলিক লাইফ-এর প্রো-প্রিফেক্ট কার্ডিনাল অ্যাঞ্জেল ফার্নান্দেজ আরতিমে এবং গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসেম্বলির সভাপতি ও ডোমুস কমিউনিস ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট এমেরিটাস কার্ডিনাল সিলভানো মারিয়া তোমাসি।

সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন— বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর সায়েন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড্যানিয়েল হোলজ, পন্টিফিক্যাল অ্যাকাডেমিজ অব সায়েন্সেস-এর চ্যান্সেলর কার্ডিনাল পিটার টার্কসন, পন্টিফিক্যাল অ্যাকাডেমি ফর লাইফ-এর সভাপতি আর্চবিশপ রেনজো পেগোরারো, হলিউড অভিনেত্রী শ্যারন স্টোনসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

ঘোষণাপত্রে ছয়টি মূল নীতির কথা তুলে ধরা হয়েছে—

১. পরবর্তী অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক অস্ত্রকে কেন্দ্র করে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে সংযম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান।

২. দায়িত্বশীল প্রযুক্তি উন্নয়ন: এআই প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানব তত্ত্বাবধানবিহীন, রিকারসিভ সেলফ ইম্প্রুভিং এআই (এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি এআই সিস্টেম তার নিজের কোড বা সক্ষমতা পরিবর্তন করতে পারা) ব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

৩. দায়িত্বশীল ব্যবহার: পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে এআইকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে এবং পারমাণবিক অবকাঠামোকে সাইবার হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখতে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আহ্বান।

৪. দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শাসন: এআই নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্যানেল এবং এআই তদারকির জন্য নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রতি সমর্থন।

৫. দায়িত্বশীল নেতৃত্ব: এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া।

৬. পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ: নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যাচাইযোগ্য উপায়ে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) ও পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিসহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *