আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কোনো বিরতি নেই। ফ্রান্স ও স্পেনসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে চরম গরমে প্রাণহানির হিসাব শুরু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে।

বৃহস্পতিবারও(২৫ জুন) অন্তত ১০ কোটি ১০ লাখ ইউরোপীয় নাগরিককে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি আফ্রিকার অনেক অঞ্চলের তুলনায়ও বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে, স্পেনে জুন মাসের নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকারি মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ‘মোমো’ জানিয়েছে, রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত ২১২ জনের মৃত্যু তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

জার্মান আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস ও ইউরোপীয় যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের ২০২৫ সালের জনসংখ্যা তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ৩৮ কোটিরও বেশি মানুষ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা অনুভব করবেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়েছে। এমন আবহাওয়ার উপযোগী নয়—এমন অবকাঠামো ও নগর পরিকল্পনাও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেন, ‘ইউরোপের এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহে জলবায়ু সংকটের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণের মূল্যই এখন মানবজাতিকে দিতে হচ্ছে। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো বন্ধ না হলে চরম তাপমাত্রা আরও বাড়তেই থাকবে।’

ফ্রান্সে বৃহস্পতিবার দেশের প্রায় পুরো অংশেই তীব্র গরমের সতর্কতা জারি ছিল। ৬ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়েছে।

এ ছাড়া, জার্মানিতে ৭ কোটি, ইতালিতে ৪ কোটি ৮০ লাখ এবং যুক্তরাজ্যে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

যদিও আগামীকাল শুক্রবার থেকে পশ্চিম ইউরোপে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে, পূর্ব ইউরোপে সপ্তাহান্ত পর্যন্ত তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত বছর ১৬ মে থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্পেনে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৩২, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

চলতি সপ্তাহে স্পেনে জুন মাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার গড় তাপমাত্রা ছিল ২৮ দশমিক ০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর মঙ্গলবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ১৭ ডিগ্রিতে।

রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ছিল রেকর্ড উচ্চতায়। সোমবার ২০ দশমিক ১৪ ডিগ্রি এবং মঙ্গলবার ১৯ দশমিক ৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এসব ‘উষ্ণ রাত’ মানুষের ঘুম ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সের প্যারিস অঞ্চলে একটি গাড়ির ভেতর থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে তীব্র গরমে এ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হলো।

পুলিশ সূত্র জানায়, সাঁ-গ্রাতিয়েন শহরে নিজ বাড়ির সামনে পার্ক করা গাড়িতে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় খুঁজে পান তার বাবা-মা।

ফ্রান্সে বুধবার ১৯৪৭ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে উষ্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেদিন জাতীয় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

প্যারিসে বুধবার তাপমাত্রা পৌঁছায় ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে, যা ১৫০ বছরে চতুর্থবারের মতো ৪০ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করল।

এর আগে সোমবার দক্ষিণ ফ্রান্সের কারপঁত্রা শহরে পারিবারিক গাড়ি থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। প্যারিসে বুধবার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বহু মানুষ ঘরের ভেতরের গরম সহ্য করতে না পেরে পার্কে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কেউ হ্যামকে, কেউ আবার ক্যাম্পিং ম্যাটে শুয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন।

২৬ বছর বয়সী মাইসাম দেকোস বলেন, ‘ফ্যান থাকা সত্ত্বেও আমার অ্যাপার্টমেন্টে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। এখানে অনেক মানুষ আছে, পরিবেশও ভালো। ঘরের ভেতরের চেয়ে বাইরে থাকাই ভালো।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *