আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার ছয় দিন পর, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জর্ডানের একটি উদ্ধারকারী দল।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, লা গুয়াইরা রাজ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুটিকে বের করে আনার সময় উদ্ধারকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট শিশুটির নাম ক্লিয়েবার মোরান বলে জানিয়েছেন। ডেলসি রদ্রিগেজ শিশুটির এই উদ্ধারকে ‘আশার মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এই ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটলো যখন জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, ভেনেজুয়েলায় হাজার হাজার মানুষ জরুরিভাবে খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে ভুগছে।

এদিকে, গত সপ্তাহের ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

নাসা-র স্যাটেলাইট তথ্যের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই শক্তিশালী কম্পনে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে যে, ক্লিয়েবারকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।

রাজধানী কারাকাসে শিশুটির চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলার অ্যাসেম্বলি প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ।

সাধারণত ভূমিকম্পের পর প্রথম তিন দিন উদ্ধার কাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে ধরা হয়, যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তারও অনেক পরে এই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হলো।

লা গুয়াইরা ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি, যেখানে স্থানীয়রা নিজেরাই উদ্ধার তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা, ইউএনএইচসিআর মঙ্গলবার জানিয়েছে, ওই এলাকায় খাদ্য সংকট প্রকট, মৌলিক পরিষেবা ভেঙে পড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।

লা গুয়াইরার ১৮ বছর বয়সী বিক্রেতা দানিয়েলা আরমাস, যিনি ভূমিকম্পের সময় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে আহত হয়েছিলেন, তিনি এএফপি-কে বলেন, কিছু ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, তবে খাবার পাওয়ার জন্য মানুষ এতটাই মরিয়া যে প্রায়ই মারামারি লেগে যাচ্ছে।

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে যে, ৩০ হাজার ভূমিকম্প কবলিত মানুষের ছয় মাসের জন্য সুরক্ষা, ত্রাণ এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য তাদের প্রাথমিক ১৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ‘চরম চাপের’ মুখে রয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেইয়ার সতর্ক করেছেন যে, টিকাদানের হার কম হওয়ায় হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

অ্যাসেম্বলি প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ বলেছেন, ক্লিয়েবারকে জীবিত উদ্ধার করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

দেশি ও আন্তর্জাতিক দলগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে এবং লা গুয়াইরাসহ অন্যান্য রাজ্যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোসহ ডজন খানেক দেশ থেকে এসে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ও ভারী সরঞ্জাম নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো। কিছু আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসতে শুরু করেছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ৪৭ টন মানবিক সহায়তা এসে পৌঁছেছে, যার মধ্যে জরুরি স্বাস্থ্য কিট, নিরাপদ প্রসবের সামগ্রী ও নবজাতকের যত্ন নেওয়ার সরঞ্জাম রয়েছে।

এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার হওয়া মৃতদেহ দাফন শুরু হয়েছে। অনেকে এখনো তাদের স্বজনদের মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন, যাদের মৃত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

লা গুয়াইরা বন্দরের একটি অস্থায়ী মর্গে উইলকার মোলালা নামে একজন জানান, তিনি তার বোন, বোনের সন্তান এবং ভাইয়ের সন্তানদের মরদেহ শনাক্ত করার জন্য অপেক্ষা করছেন।

তিনি বলেন, “আমার পরিবারে ১১ জন সদস্য ছিল। কেবল দুজন বেঁচে আছি কারণ আমরা তখন কাজে ছিলাম।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *