বিনোদন ডেস্ক : সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিশিষ্ট গণসংগীত শিল্পী কামরুদ্দীন আবসার।

গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে সোমবার (১ জুন) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীরা ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা নিবেদনকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ মার্কসবাদী, ফ্যাসিবাদ বিরোধী বাম মোর্চা, জাতীয় গণফ্রন্ট, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমগীত, সমাজ চিন্তা ফোরাম, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্র, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট। গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের জোটভুক্ত সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন উপলক্ষে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন আনু মোহাম্মদ, প্রয়াত শিল্পীর ছেলে আদনান মুকিত এবং ডা. হারুন অর রশীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন।

বক্তারা বলেন, কামরুদ্দীন আবসার শৈশব থেকেই গণসংগীতকে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ মার্কসবাদী সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি সারাজীবন সক্রিয় ছিলেন। তার হাত ধরে অনেক শিল্পী গণসংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম, সভা-সমাবেশ ও গণআন্দোলনে তিনি সংগ্রামের গান গেয়ে মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

গত শনিবার (৩০ মে) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন কামরুদ্দীন আবসার।

১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, মুন্সি রইসউদ্দীন এবং সুরকার আলতাফ মাহমুদ-এর কাছে সংগীতে তালিম গ্রহণের পর ১৯৭২ সালে আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যানিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি সেগুনবাগিচা মিউজিক কলেজে অধ্যয়ন করেন।

একসময় তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন-এর সংগীত ও পরিচালনা বিভাগে সহকারী হিসেবে কাজ করলেও গণসংগীত শিল্পী হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন। ‘চল রে ভাই, উজান বেয়ে যাই’, ‘আমি কোনো ভালোবাসার গল্প জানি না, যেটুকু জেনেছি সবটুকুই যুদ্ধের’ এবং ‘তোমরা যদি বলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, আমি মানবো না’-এ ধরনের গান মানুষের সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত করেছে। তার প্রকাশিত অ্যালবামের মধ্যে ‘মে দিবসের গান’ এবং ‘বাংলার কমরেড বন্ধু’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ লেখক শিবির-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন সংগঠনটির সংগীত ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। সত্তরের দশকের দুর্ভিক্ষের সময় গান গেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন, গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *