বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তরে আবারও সামনে এসেছে পদোন্নতি বাণিজ্য, বিধি লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রভাব, আদালতের মামলা গোপন এবং শত শত কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের বিস্ফোরক অভিযোগ। বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ই/এম অংশের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে পুরো অধিদপ্তরে এখন তীব্র উত্তেজনা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট সরকারি চাকরি বিধিমালা, উচ্চ আদালতের বিচারাধীন বিষয় এবং প্রশাসনিক নৈতিকতা উপেক্ষা করে বিতর্কিত ও অযোগ্য কর্মকর্তাদের উচ্চপদে বসানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারি করা একটি স্মারকে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ২৭, ২৮ ও ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির দাবি তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ ও বিপক্ষে পৃথক আবেদন জমা পড়ায় প্রশাসনের ভেতরে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মন্ত্রণালয় প্রধান প্রকৌশলীর কাছে সুস্পষ্ট মতামত চাইলেও অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে পাঠানো মতামতে প্রকৃত তথ্য আড়াল করে বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতির পথ সহজ করার চেষ্টা করা হয়।

WhatsApp Image 2026 05 18 at 2.05.56 PM

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলাকে কেন্দ্র করে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা থেকে পাঠানো এক স্মারকে দাবি করা হয়, ১৭টি পদ সংরক্ষণ সংক্রান্ত মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হয়েছে। কিন্তু ২৭, ২৮ ও ৩০তম বিসিএস কর্মকর্তাদের দাবি, আপিল বিভাগে Civil Petition No. 4340/2024 এখনো চলমান রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, “Rejected for not press” মানে মামলা চূড়ান্তভাবে খারিজ নয়; বরং পুনরায় আবেদন করার সুযোগ রেখে আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চলমান মামলাকে “খারিজ” দেখিয়ে মন্ত্রণালয়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি সহজ হয়।

এদিকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭-এর ৮ ধারা নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের দাবি, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে ৫ম গ্রেডের ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই। অথচ একটি প্রভাবশালী চক্র সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ পাওয়া কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধায় উচ্চপদে বসানোর চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যেহেতু ওই কর্মকর্তারা একই নিয়োগ বিধিমালার আওতায় ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন, তাই পদোন্নতির শর্তও তাদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতামতে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশে পদ সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় কিছু কর্মকর্তাকে ব্যাকডেট দেখিয়ে যোগদান করানো হয় এবং পরে তাদের জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, আদালতের আদেশ বহাল থাকা অবস্থায় কীভাবে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের বিভিন্ন তারিখে যোগদান দেখানো হলো এবং সেই সময়ের বেতন-ভাতাও উত্তোলন করা হলো। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঠানো মতামতে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।

সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান ওরফে বিপ্লবকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পক্ষে মতামত দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছেন এবং অবৈধ পদোন্নতির নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা এসব অনিয়মের বিষয়ে নীরব থেকে কার্যত পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

WhatsApp Image 2026 05 17 at 11.31.07 PM

উল্লেখ্য, সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে এর আগেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে কাশিমপুর কারাগার-২ প্রকল্পের HT Cable Fault Locator মেশিন সরবরাহ সংক্রান্ত ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও “চাকরি জীবনের প্রথম অপরাধ” বিবেচনায় তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, তিনিই কীভাবে আবার জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও পদোন্নতির মতো স্পর্শকাতর প্রশাসনিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

WhatsApp Image 2026 05 19 at 1.41.30 PM (1)

গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে। সেই সিন্ডিকেটই এখনো পদোন্নতি, পোস্টিং, টেন্ডার ও জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখনো আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম আহমেদুল হককে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন লিখিত বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই নির্ধারিত প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ১১ জনকে চাকরি দেওয়া হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিসিএস ক্যাডারের একাংশ আদালতের শরণাপন্ন হলে হাইকোর্ট ১৭টি পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের চাকরিতে বহাল রাখা হয় এবং অনেককে জ্যেষ্ঠতাতেও এগিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে আছে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের নাম। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত বিসিএস পদ্ধতি এড়িয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে সমীরণ মিস্ত্রী, জিয়াউর রহমান, মোঃ আবু তালেবসহ আরও কয়েকজনকে বিশেষ সুবিধায় নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং সাবেক এমপি শেখ সেলিম ও শেখ হেলালের প্রভাবেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

WhatsApp Image 2026 05 14 at 3.07.02 PM (1)

জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে আরও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একদিকে বিআইডাব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করেছেন, অন্যদিকে একই সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকেও বেতন নিয়েছেন। একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও, যারা অন্য সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকেও পরে ব্যাকডেট দেখিয়ে গণপূর্তে যোগদানের সুবিধা নেন বলে দাবি করা হয়েছে।

সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের “পি পি ডব্লিউ ডি উড ডিভিশন” ঘিরেও নতুন করে বড় ধরনের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাঠ ও ফার্নিচার প্রকল্পকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম একটি নির্দিষ্ট ইউনিটে পদায়নের জন্য প্রভাবশালী এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপিভুক্ত প্রকল্পকে দুই ভাগে ভাগ করে কমিশন নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া হাতিল, পশ ফার্নিচার, রিগেল ফার্নিচার, আকতার ফার্নিচার ও ডট ফার্নিচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ ভাগ-বাটোয়ারা এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে। তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি প্রায় দেড়শ কোটি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সারওয়ার জাহান ওরফে বিপ্লবকে ঘিরেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পক্ষে মতামত দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছেন এবং অবৈধ পদোন্নতির নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা এসব অনিয়মের বিষয়ে নীরব থেকে কার্যত পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে এর আগেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে কাশিমপুর কারাগার-২ প্রকল্পের HT Cable Fault Locator মেশিন সরবরাহ সংক্রান্ত ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও “চাকরি জীবনের প্রথম অপরাধ” বিবেচনায় তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, তিনিই কীভাবে আবার জ্যেষ্ঠতা তালিকা ও পদোন্নতির মতো স্পর্শকাতর প্রশাসনিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে। সেই সিন্ডিকেটই এখনো পদোন্নতি, পোস্টিং, টেন্ডার ও জ্যেষ্ঠতা তালিকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের ভেতরে থাকা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখনো আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে।

পুরো ঘটনায় এখন সবার নজর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দিকে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, মন্ত্রণালয় কি নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, নাকি চলমান মামলা, সরকারি চাকরি বিধি, আদালতের আদেশ এবং দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হবে? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হলে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ কর্মকর্তাদের আস্থা আরও কমে যাবে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *