ডেস্ক নিউজ : জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কোন বিধিতে এ বিষয়ে আলোচনা হবে—তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি দল ও বিরোধী দল সমঝোতায় পৌঁছেছে। নিয়মিত কার্যক্রম মুলতবি না করে আগামী তিন দিনের মধ্যে এক ঘণ্টা এ বিষয়ে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) সংসদে অনির্ধারিত এ বিতর্কের এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৩০ মার্চ জ্বালানিমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই, সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে ৩০০ বিধিতে যে বিবৃতি দিয়েছেন, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো সংকট নেই—এটা আসলে সংসদের ভেতরে নেই। সংকটটা সংসদের বাইরে।’

মূলত বিরোধীদলীয় নেতার একটি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ থেকে এ বিতর্কের সূচনা হয়। জ্বালানিসংকট ও এর প্রভাবে জনজীবনে সৃষ্ট সমস্যার ওপর আলোচনা চেয়ে ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। একই ধরনের প্রস্তাব দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের নুরুল ইসলামও।

তবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল প্রস্তাব দুটি গ্রহণ না করে বলেন, “ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিভিন্ন বিধিতে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টমন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছেন। এরপরও আলোচনা করতে হলে যথাযথ বিধিতে নোটিশ আনতে হবে।’

এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘যদি এই সুযোগই দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা কী ধরে নেব? আমরা ধরে নেব যে জনজীবনে যে প্রবলেমটা সবচেয়ে বার্নিং, সেটা নিয়ে এই সংসদে আলোচনা করতে পারলাম না। এটা কি আমাদের জন্য একটা দুর্ভাগ্য হবে না?’

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘সেই বিবৃতি দিয়ে কী হবে? এই বিবৃতিতে কী সমস্যার সমাধান হবে? একদিকে বলা হচ্ছে, তেলের কোনো সংকট নেই। আরেক দিকে বাস্তবে যেটা ঘটছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

বিরোধী দলের কোনো নোটিশ বিবেচনায় নেওয়া না হলে তারা সংসদে থাকবেন কেন—এমন প্রশ্ন রেখে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারলে সংসদে থাকার স্বার্থকতা নেই। সংসদের প্রতিটি সেকেন্ডে জনগণের টাকা খরচ হচ্ছে। তিনি তার নোটিশটি দু–এক দিন পর আলোচনার জন্য নির্ধারণ করার অনুরোধ করেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবটি অবশ্যই আলোচনার যোগ্য। এটি জাতীয় জীবনে জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বটে। অধিবেশনের কার্যক্রম মুলতবি না করে অন্যভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে খুব বেশি হলে দু-চারবার মূলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুটি মূলতবি প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে। এটা ইতিহাসে অনন্য নজির। আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে এটা অনুসরণ করার চেষ্টা করা হবে। তিনি জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারায় নোটিশ দেওয়া বা ৬৮ বিধি অনুযায়ী আলোচনা করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।

জ্বালানিমন্ত্রীর বিবৃতির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার পরে এবং দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছেন, সেটা জাতির কাছে পরিষ্কার…আমাদের দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। সেটা আমরা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছি। মন্ত্রী দেখিয়েছেন।’

সহনীয় মাত্রায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একেবারে শেষের দিকে এসে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য বা পাচার বন্ধ করতে সরকার তেলের দাম কিছুটা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

এর জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব সুন্দর করেই বলেছেন, কোনো সংকট নেই। কিন্তু সংকটটা সংসদের বাইরে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, সংকট আছে বলেই জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য হাইকোর্টের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় দুই দিন ভার্চ্যুয়ালি কোর্ট বসছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সংকটটা সরকারের সৃষ্টি নয়, এটি বৈশ্বিক বিষয়—আমরা তা বুঝি। কিন্তু সব দায়িত্ব যদি সরকারি দলই পালন করে, তাহলে বিরোধী দলের ভূমিকা কোথায়?’

পরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘সংসদের কার্যক্রম মুলতবি না করেও আধা ঘণ্টার জায়গায় এক–দেড় ঘণ্টা আলোচনা হতে পারে।’ এতে সম্মতি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তারা নোটিশ দেবেন, তবে সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আলোচনা চান।

শেষে স্পিকার জানান, ‘বিরোধীদলীয় নেতা নোটিশ দিলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অর্থবহ আলোচনার জন্য যা করণীয়, সংসদ তা করবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *