
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথভাবে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তৎক্ষণাৎ পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে তেহরান। এতে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য।
এই যুদ্ধের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পানিসংকটের তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কেননা, মরুপ্রধান এই অঞ্চলের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট (পানির লবণাক্ততাদূরীকরণ কেন্দ্রগুলো) এখন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
গত রবিবার বাহরাইনের একটি পানি শোধনগার ইরানি ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মাত্র একদিন আগে ইরান জানিয়েছিল, তাদের কেশম দ্বীপের একটি পানি শোধনগারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট কী?
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট মূলত সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে লবণ ও দূষণ অপসারণ করে পানযোগ্য পানি তৈরি করে।
এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত দুটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়— তাপ প্রয়োগ করে পানি বাষ্পে পরিণত করে পরে তরলে রূপান্তর এবং মেমব্রেন প্রযুক্তি, বিশেষ করে ‘রিভার্স অসমোসিস’, যা লবণ ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশ এই রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
মধ্যপ্রাচ্যে এর গুরুত্ব
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত শুষ্ক। বৃষ্টিপাত কম এবং মিঠা পানির উৎস সীমিত। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলো পানির বড় অংশই পায় সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে।
আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির তথ্যমতে, বিশ্বে মোট ডিস্যালাইনেশন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি সদস্য দেশগুলো। বিশ্বের মোট পরিশুদ্ধ সমুদ্রের পানির প্রায় ৪০ শতাংশ এখানেই উৎপাদিত হয়।
দেশভেদে পানির নির্ভরতার হারও অনেক বেশি। যেমন- কুয়েতে সুপেয় পানির প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে প্রায় ৭০ শতাংশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪২ শতাংশ পানি ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। এসব দেশে চার শতাশিক ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে।
হামলার সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব স্থাপনায় হামলা হলে শুধু পানি সরবরাহই নয়, পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অতীতে ১৯৯০–৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক কুয়েতের বেশিরভাগ ডিস্যালাইনেশন স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে দেশটির পানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে- শহরগুলোর পানির সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কোন দেশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে- যেমন: বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার। কারণ এসব দেশের বিকল্প পানি উৎস খুবই সীমিত এবং কৌশলগত পানির মজুতও তুলনামূলক কম।
তবে বড় দেশগুলো কিছুটা প্রস্তুতি রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ৪৫ দিনের পানির মজুত ধরে রাখার পরিকল্পনা করেছে।
সমাধানের পথ
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে পানি নিরাপত্তাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে- যৌথ আঞ্চলিক পানির মজুত গড়ে তোলা, সমন্বিত ডিস্যালাইনেশন নেটওয়ার্ক তৈরি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত ছোট প্ল্যান্ট বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘ হলে এবং জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোর মতো পানির স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে মানবিক এই সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা
