বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে ভবন রক্ষণাবেক্ষণ খাতের প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোনো কাজ না করেই প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন বাচ্চু মিয়া। বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর যে, দপ্তরের ভেতরেই এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এলজিইডির রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুজ্জামানের স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় জানানো হয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এলজিইডি ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মঞ্জুর সাদেককে তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাচ্চু মিয়া নিজের প্রভাব ব্যবহার করে এলজিইডির তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি লাইসেন্স নিজের পরিবারের সদস্যদের নামে গ্রহণ করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তি একটি সংস্থায় মাত্র একটি তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি লাইসেন্স করতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বাচ্চু মিয়া তার আপন ভাই মো. শহিদুল ইসলাম (সুমন)-এর নামে দুটি আলাদা লাইসেন্স করান।

এর মধ্যে একটি লাইসেন্স ব্যবহার করে “মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ”-এর নামে বিনা দরপত্রে অফিস ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ দেখানো হয়। বাস্তবে কোনো কাজ না করেই সেখান থেকে ৪৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, নিজের মেয়ে মোহনার নামে খোলা “মোহনা এন্টারপ্রাইজ”-এর মাধ্যমে আবাসিক ভবন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেখিয়ে আরও ৪৩ লাখ ৯ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই কাজগুলোর ক্ষেত্রেও বাস্তবে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি।

এছাড়াও ছোট ছোট কোটেশনের মাধ্যমে বাকি অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবাসিক ভবনের বাসিন্দা ও এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবনগুলোতে কোনো দৃশ্যমান রক্ষণাবেক্ষণ কাজ হয়নি। অভিযোগ ওঠার পরই কর্তৃপক্ষ তদন্তের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়।

এদিকে বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চলমান অনুসন্ধান নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে আপত্তি তুলেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং কে তাকে তদন্ত করবে তা নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। বিষয়টিকে অনেকেই তদন্ত কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস হিসেবে দেখছেন।

দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে বাচ্চু মিয়ার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি কিংবা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

এলজিইডির ভেতরে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই তদন্ত শুধু একটি আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয়; বরং এটি পুরো রক্ষণাবেক্ষণ খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির চিত্র উন্মোচনের একটি সুযোগ। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *