নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নকারী ‘মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে’ বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পটির কাজ কাগজে-কলমে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রায় কিছুই পাওয়া যায়নি। মোট ২৪৮ কোটি টাকার এই পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে ঠিকাদারি নিয়োগ থেকে শুরু করে বিল-ভাউচার তৈরি, কাজের মান, কৃষকদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই অনিয়মের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছে দুদক।

২০২০–২১ অর্থবছরে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর এলাকার কৃষিজমিতে উন্নত সেচব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। লক্ষ্য ছিল বছরে বাড়তি ৫১ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে—কাগজে অগ্রগতি দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ কাজ হয়নি। স্থানীয় কৃষক এবং সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে দিয়ে ঠিকাদারি কাজ করিয়ে প্রকল্প পরিচালক এবং কিছু প্রকৌশলী মিলে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

এই দুর্নীতির অভিযোগে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মাহবুব উল আলম হানিফের নামও উঠে এসেছে। ঠিকাদার নিয়োগে তার প্রভাব বিস্তারের কথাও দুদকের নথিতে এসেছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত শুরুর পর প্রকল্প পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি অনুসন্ধান টিম মাঠে নেমেছে। একই সঙ্গে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলের মোট ১৯ জন কর্মকর্তাকে আলাদা দিনে দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে।

২৫ নভেম্বর তলব করা হয়েছে সহকারী প্রকৌশলী এরশাদ আলী, হাফিজ ফারুক এবং উপসহকারী প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম, আদনান আল বাচ্চু, আসিফ মাহমুদ ও আব্দুল্লাহ আল মামুনকে।
২৬ নভেম্বর যেতে হবে খালেদা ইয়াসমিন, দিদার-ই-খোদা, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল হালিম, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও হুমায়ুন কবিরকে।
আর ২৭ নভেম্বর হাজির হবেন শাহজালাল আবেদীন, মাযহারুল ইসলাম, শাহরিয়ার আহমেদ, লিমন হোসেন, ইকরামুল হক, শ্যামল হোসেন ও আশরাফুল ইসলাম।

অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—প্রতি সেচ প্লান্ট স্থাপনে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগেও মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ আছে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ আছে, কাজ না করেই ভুয়া বিল তোলা হয়েছে এবং সেই অর্থ থেকে ৪০ শতাংশ নিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক, বাকিটুকু পেয়েছে ঠিকাদারি পক্ষ।

প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে নির্ধারিত নকশা ও মান বজায় রাখা হয়নি বলেও জানায় দুদক। এমনকি ঠিকাদারদের বিল ছাড় করতে সহকারী প্রকৌশলী, সাইট অফিসার ও হিসাব সহকারী পর্যন্ত নির্দিষ্ট শতাংশ কমিশন চাইতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় বিএডিসি কার্যালয়ে অভিযান চালায়। সেখানে দেখা যায়—১৯২ কোটি টাকা ব্যয়ের কাগজপত্র দেখানো হলেও মাঠে কাজের কোনো বাস্তব চিহ্ন নেই। দুদকের কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নীলকমল পাল বলেন, অভিযোগ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে দুদক।

এ বিষয়ে বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন খান ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এম এস সাঈদের মতামত নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য দেননি। অন্যদিকে স্থানীয়রা দাবি তুলেছেন—দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের অবশিষ্ট ৫৬ কোটি টাকার কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *