নিজস্ব প্রতিবেদকঃ টলটলে মুক্তোর মতো শিশির যেন ভোরের আলোর সঙ্গে প্রতিদিন নতুন জন্ম নেয়। ঘাসের ডগায়, ধানের শীষের মাথায় তারা চিকচিক করে ওঠে। দূরদিগন্ত অবধি ছড়িয়ে থাকা ধানক্ষেত তখন সোনালি আভায় দীপশিখার মতো ঝলমল করে। সবুজ স্বপ্নের সঙ্গে হলুদ সোনালি রঙ একাকার হয়ে বাংলার হেমন্তকে সাজিয়ে তোলে এক অপূর্ব মায়াবী আলোয়। অখণ্ড নীল আকাশ, কোমল সোনাঝরা রোদ আর হিমশীতল বাতাস—সব মিলিয়ে প্রকৃতির ভাষা যেন বলে ওঠে, এসেছে অগ্রহায়ণ।

দিনগুলো ছোট হয়ে আসে। শেষ বিকেলে কুয়াশার পাতলা চাদর নেমে আসে নিঃশব্দে, ঠিক শিশিরের মৃদু টুপটাপ শব্দের মতো। নিশিথের গাঢ় নিস্তব্ধতায় সেই শিশির যেন রূপ নেয় অদৃশ্য সংগীতে। আর সে সুরেই ভেসে ওঠে কৃষকের মন—কারণ উঠোনে উঠতে চলেছে নতুন ধানের ম-ম গন্ধ, আসন্ন নবান্নের আনন্দ।

অগ্রহায়ণ মানেই বাংলার অন্ন-উৎসব, কৃষিজীবনকে ঘিরে অনাদিকাল ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্যের নবজাগরণ। নতুন আমন ধান ঘরে তুলেই শুরু হয় নবান্ন উৎসব। হিন্দু লোকবিশ্বাসে এই দিনকে ধরা হয় বাৎসরিক মাঙ্গলিক এক শুভক্ষণ হিসেবে। নতুন ধানের ভাত, বিবিধ তরকারি, পিঠেপুলি—সব মিলিয়ে গ্রাম মহল্লা হয়ে ওঠে উৎসবের আসর। অনেক পরিবারে মেয়েদের ডেকে আনা হয় বাপের বাড়িতে; কোথাও হয় মসজিদে শিন্নি বিতরণ, আবার হিন্দু কৃষক পরিবারে চলে পূজার আয়োজন। হিন্দু লোকাচারে পিতৃপুরুষ, দেবতা, এমনকি কাক পর্যন্ত নতুন অন্ন উৎসর্গ করার রীতি আছে। মৃতের আত্মার কাছে খাবার পৌঁছে যায় কাকের মাধ্যমে—এ বিশ্বাসে এই নৈবেদ্য পরিচিত ‘কাকবলী’ নামে।

নবান্নের উচ্ছ্বাস শুধু গ্রামেই থেমে থাকে না। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে আয়োজন করা হচ্ছে নবান্ন উৎসব। অগ্রহায়ণের প্রথম দিনকে ‘আদি নববর্ষ’ আখ্যা দিয়ে উদযাপনের ডাক দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। দেশের বহু স্থানে বসছে গ্রামীণ মেলা—যেখানে মানবসমাগমে জমে উঠবে মিলনমেলা।

ধান কাটা মৌসুমে কৃষকের ঘর ভরে ওঠে ‘রাশি রাশি ভারা ভারা সোনার ধানে’। কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তের সকালে ভেসে আসে ধান ভাঙার গান, ঢেঁকির তাল—যদিও যান্ত্রিকতার যুগে ঢেঁকির শব্দ আর অতটা শোনা যায় না, তবু সেই স্মৃতিই হেমন্তকে রাখে চিরন্তন আবহে। নতুন চালের পিঠার জন্য সংগ্রহ হতে থাকে খেজুরের রস; নতুন রস আর নতুন চালের এই যুগলবন্দী যেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অমোঘ অঙ্গ।

লোকগবেষকদের মতে, কৃষিনির্ভর সভ্যতা গড়ে ওঠার পর থেকেই চলে আসছে নবান্নের জনপ্রিয়তা। কখনও অগ্রহায়ণই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস—‘অগ্র’ মানে প্রথম, ‘হায়ণ’ মানে মাস। অতীতে উৎসবটি পালন করতেন মূলত হিন্দু গৃহস্থরা। আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ বা পৌষে ঘরে ঘরে জমত নবান্ন। হেমন্তের প্রকৃতি যে কী অদ্ভুত সুন্দর, তা কবি-সাহিত্যিকেরা দীর্ঘকাল ধরেই বর্ণনা করে আসছেন মুগ্ধ কণ্ঠে। জীবনানন্দ দাশের স্বপ্নময় পঙ্‌ক্তি যেন নবান্নকেই স্মরণ করিয়ে দেয়—
‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/
হয়তো মানুষ নয়—হয়তো শঙ্খচিল, শালিখের বেশে…’।

তার আরেক কবিতায় হেমন্তের প্রাচুর্য ধরা দেয়—
‘চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল,/
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল…।’

বর্তমানে দেশের বহু অঞ্চলে চলছে আগাম আমন ধান কাটা ও মাড়াই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল উৎপাদনের সময়—প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন আমন উৎপাদিত হয় এই মৌসুমেই। রবীন্দ্রনাথও নতুন ফসলের আনন্দকে তুলে ধরেছিলেন—
‘ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।’

অগ্রহায়ণের সঙ্গে শীতের দশ প্রহরণ শুরু হয়। কুয়াশার পর্দা নামতে থাকে ধীরে ধীরে। জীবনানন্দের ভাষা তখন সত্যি হয়ে ওঠে—
‘শিশির পড়িতেছিল ধীরে ধীরে খসে;/
নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি
উড়ে গেল কুয়াশায়— কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরও।’

হেমন্তের প্রকৃতি, নতুন ধানের গন্ধ, কৃষকের মুখের হাসি—সব মিলিয়ে নবান্ন শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বাংলার জীবন-স্পন্দন, বাংলার মাটির সঙ্গে মানুষের শাশ্বত বন্ধনের অবিচ্ছেদ্য উদযাপন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *