বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইডেন গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিস্তৃত দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজস্ব প্রভাব ও সুবিধা আদায়ে নানা ধাপেই চাপ প্রয়োগ করছেন, যার মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া, কাজের বিল পরিশোধ, উপকরণ সরবরাহ অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত।

ঠিকাদারদের মতে, কোনো প্রকল্পের প্রকৃত মূল্য অনুযায়ী কমিশন না দিলে ফাইল আটকে রাখা, মাপ-জোক যাচাইয়ে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা এবং রাজনৈতিক নাম ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করা তার একটি নিয়মিত কৌশল। কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “যে কাজের প্রকৃত মূল্য ৫০ লাখ, সেখানে অতিরিক্ত কমিশন হিসেবে ৫ থেকে ১০ শতাংশ দাবি করা হয়।” ফলে যারা ঘুষ দিতে অনিচ্ছুক, তারা প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েন।

স্থানীয় সূত্র বলেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাকিবুলের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা ও ‘নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার’-দের জন্য সুবিধা সৃষ্টির চেষ্টা স্পষ্ট ছিল। ঠিকাদার সম্প্রদায়ের একাংশ অভিযোগ করেছেন, টেন্ডার-বাণিজ্যের পাশাপাশি নিয়মিত বদলি, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়, উপকরণ সরবরাহ অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তিনি রাজনৈতিক সুপারিশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে শুধু কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, প্রকল্পের গুণগত মানও হ্রাস পাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। জানা গেছে, তেজগাঁও গণপূর্ত উপবিভাগে কাজ করার সময় রাকিবুল কোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পে সুযোগ দেননি, বরং নিজেই ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছেন। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘দেশ উন্নয়ন’-কে বিশ কোটি টাকার ভুয়া ভেরিয়েশন দেখিয়ে দুই কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। এছাড়া তেজগাঁও বিসিক ভবন নির্মাণের সময় বেজমেন্টে নানা ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তিনি উৎকোচ নিয়ে ছাড়পত্র দিয়েছেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘কুশলী নির্মাতা’ নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেও রাকিবুলকে ৫ শতাংশ কমিশন প্রদান করে সম্পূর্ণ বিল পেয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাকিবুল হাসান তেজগাঁও গণপূর্ত উপবিভাগে শিল্প প্লট ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে ঢাকায় জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়, কুমিল্লা শহরে দশ কাঠা জমি এবং গাজীপুরে ত্রিশ একর জায়গার উপর একটি রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া গণপূর্তে গুঞ্জন রয়েছে যে, দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে তিনি কয়েক শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন।

উল্লেখযোগ্য, বর্তমানে রাকিবুল নিজেকে একপি রাজনৈতিক দলের অর্থদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জানা গেছে, তিনি উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়নের জন্য দলের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনে অর্থ দান করছেন।

গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, মাঠ পর্যায়ে সরকারি দরপত্রের কাজ সঠিকভাবে হয়েছে কিনা, গুণগত মান যাচাইসহ বিভিন্ন কাজ সচরাচর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাকিবুল নিজস্ব সুবিধার জন্য কমিশন ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন ত্রুটিপূর্ণ কাজের ছাড়পত্র দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি নির্মাণ কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আচরণ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। পাশাপাশি ঘুষের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি এবং নিয়মিত অডিট ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে রাকিবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোনো প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিবেদককে বিভিন্ন মহল থেকে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *