
বাণিজ্য ডেস্কঃ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ‘সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক (অক্টোবর, ২০২৫)’-এ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
জিইডি বলেছে, নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনসংক্রান্ত কার্যকলাপ বাড়বে, যা অর্থনীতিতে কিছুটা গতি আনতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সহায়ক হতে পারে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিদ্যমান।
প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণ
ইকোনমিক আপডেট অংশে জিইডি সাম্প্রতিক মাসগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতির চারটি দিক তুলে ধরেছে—
১. সরকারের তৎপরতায় চালের দাম নিম্নমুখী হয়েছে।
২. মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেও রপ্তানিতে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
৩. ব্যাংক আমানত বাড়ছে, তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমছে।
৪. প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে রাজস্ব আয় বাড়ছে।
ইকোনমিক আউটলুক অংশে বলা হয়েছে, সরকারের ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগে ব্যাংক আমানত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমায় অনেকেই ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিও আমানত বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে এ ইতিবাচক দিকের মধ্যেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগের প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.৩৫ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও এর প্রভাব
জিইডি বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি-নির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে আগ্রহী হচ্ছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ কমে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী বলেন, “নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাজনৈতিক মতভেদের কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা ভোটারদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করবেন, যা মূলত অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে। এতে কালো টাকা ও নগদ অর্থের চলাচল বাড়বে, যা সাময়িক ভোগ বাড়ালেও মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।”
ড. মুজেরীর মতে, একদিকে ঋণ ও বিনিয়োগে স্থবিরতা, অন্যদিকে অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি—এই দুই কারণ মিলিয়ে নির্বাচনের আগে ও পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
