
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের দফার আলোচনার পরপরই হামলা ও নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ঘটায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আর কোনও আলোচনায় তেহরানের আস্থা নেই বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
শনিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর ভিত্তি কী হতে পারে, তা নিয়েই ইরানের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের কোনও আস্থা নেই। আমরা জানি না, ঠিক কোন ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে কোনও সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।”
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান পেজেশকিয়ান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সেখানে ওয়াশিংটনের কাছে তেহরান এমন একটি সাত দিনের রোডম্যাপ উপস্থাপন করেছে, যার লক্ষ্য সংঘাতের অবসান এবং শর্তসাপেক্ষে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।
সাত দিনের রোডম্যাপ
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগবে। এরপর ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার কথা রয়েছে।
তবে এর আগে ওয়াশিংটনকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা। একই সঙ্গে লেবানন ও ইয়েমেনসহ অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করারও দাবি জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তান ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন পেজেশকিয়ান।
জুনের সমঝোতায় ফিরতে চায় তেহরান
পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান উদ্যোগটি জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে তৈরি। ওই সমঝোতা পরে ভেঙে পড়ে এবং জুলাইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটিকে কার্যত বাতিল ঘোষণা করেন। নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে তেহরান ওই সমঝোতার কিছু শর্ত বাস্তবায়নের পথ আবারও উন্মুক্ত করতে চাইছে।
তেহরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে আগের সমঝোতার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আলোচনার বিষয়ে কিছু ইতিবাচক বার্তা এলেও চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
হরমুজ বন্ধের দায় অস্বীকার
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার জন্য ইরানকে দায়ী করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেছেন পেজেশকিয়ান। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রই আগে ইরানের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।
তিনি বলেন, ইরানের পথ যখন রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন হরমুজে তেহরানের পদক্ষেপ ছিল তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমেই বর্তমান সংকটের সমাধান সম্ভব। যুদ্ধের অবসান হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
ইরানকে সহজে পরাজিত করা যাবে না
সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতের আগ্রাসী পক্ষ হিসেবেও বর্ণনা করেন। তার দাবি, গত ২০০ বছরে ইরান কোনও দেশ আক্রমণ করেনি।
ইরান সরকার ‘কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়বে’- এমন ধারণা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আঞ্চলিক দেশগুলোকে সংঘাতে টেনে এনেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব বক্তব্য ইরানের নিজস্ব অবস্থান হিসেবে এসেছে; এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাতের কারণ ও নিজেদের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ মোকাবিলা করেছি এবং ভবিষ্যতেও দৃঢ়ভাবে টিকে থাকব।”
তবে একই সঙ্গে তিনি আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যা ও শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কূটনীতির মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনের সুযোগ থাকলে সেই পথেই এগোনো উচিত।
এদিকে ইরানের প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরান শনিবারও যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিল। এর মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও ইরান তখনও ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় ছিল। সূত্র: আল-জাজিরা
