ডেস্ক নিউজঃ সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি ও লেটার রাইটার মডিউল’ চালু করছে ডাক বিভাগ। প্রাথমিকভাবে দেশের ১২টি এলাকায় এ সেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা থেকে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত এ সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।

ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সারা দেশে ১২টি ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনায় এ সেবা চালু হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় শিগগিরই পাহাড়ি অঞ্চল বান্দরবান এবং হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের সাল্লা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা থেকে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত এ সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।

এর আগে গত ২৯ জুলাই ডাক ভবনে এ সেবার উদ্বোধন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। প্রথম পর্যায়ে ঢাকার ভেতরে চারটি ও ঢাকার বাইরে চারটিসহ মোট আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালু করা হয়েছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিসের কারিগরি প্রস্তুতি সম্পর্কে ‘মেইল প্রসেসিং এবং লজিস্টিক সার্ভিস টেকসই ও আধুনিকীকরণ’ প্রকল্পের পরিচালক ও অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, প্রকল্পের আওতায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ও লেটার রাইটার মডিউল পাইলট ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে মাঠপর্যায়ে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে এবং অনেকের কর্মসংস্থান হবে।

তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে সারা দেশে ৬ হাজার মোবাইল সেট ও ৫০০ কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি সফটওয়্যার তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।

সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুসরণ করে ডাক বিভাগ আটটি সুনির্দিষ্ট কাজ হাতে নিয়েছে, যার অন্যতম হলো ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালু করা।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে মৌসুমি ফলসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগের সক্ষমতা আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমানে ২০ থেকে ৩০ কেজি ওজনের ফলের ক্রেটসহ বিভিন্ন পণ্য নিরাপদে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের যেকোনো জেলায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যন্ত উপজেলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা সময় লাগছে। কোনো অভিযোগ ছাড়াই এসব কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পার্সেল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অগ্রগতি সম্পর্কে অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহ আলম বলেন, আগে পরিবহনের সময় কোন পণ্য কোথায় রয়েছে, তা জানার সুযোগ ছিল না। বর্তমানে প্রতিটি পার্সেলের গায়ে বারকোড ব্যবহার করে ডমেস্টিক মেইল সিস্টেমের (ডিএমএস) মাধ্যমে তা ইস্যু ও বিলি করা হচ্ছে। ফলে গ্রাহকরা ঘরে বসেই তাদের পণ্যের হালনাগাদ তথ্য জানতে পারছেন।

ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আরও কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমির দলিল, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সেবা। ই-কমার্স পণ্যের ক্যাশ অন ডেলিভারি সেবা চালুর কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিদেশে পার্সেল পাঠাতে স্বল্প মাশুলে এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস (ইএমএস) সুবিধাও রয়েছে।

ডাক বিভাগের সেবার ধরনে পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে মহাপরিচালক বলেন, চিঠি, দ্রুতগামী পত্র, পার্সেল ও প্যাকেটজাতীয় ডাকদ্রব্য গ্রহণ, পরিবহন ও বিলি করা ডাক বিভাগের মূল কাজ বা কোর সার্ভিস। এর বাইরে সঞ্চয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র পরিচালনা, পাঠ্যবই ও টিকা বিতরণ, লটারির টিকিট বা প্রাইজবন্ড বিক্রির মতো কাজগুলো মূলত এজেন্সি ফাংশন, যা সরকার বিভিন্ন সময়ে ডাক বিভাগকে দিয়ে থাকে।

ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক চিঠি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রযুক্তির প্রসারে এখন মানুষ লাইভ ভিডিও কল ও এসএমএসের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করতে পারছেন। ফলে চিঠির উত্তরের জন্য আগের মতো মাসের পর মাস অপেক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে না। একইভাবে সরকারের সার্বিক নীতির কারণে সবকিছু অনলাইনে করার প্রবণতা বেড়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোও এখন কাগজের নথির পরিবর্তে ই-নথি ও ডি-নথি ব্যবহার করছে। ফলে দাপ্তরিক চিঠিপত্রের ব্যবহারও ক্রমে কমছে।

চিঠির প্রচলন কমলেও ই-কমার্সের হাত ধরে ডাক বিভাগের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বলে মনে করেন মহাপরিচালক। তিনি বলেন, দেশের নাগরিকরা অনলাইনে যেসব পণ্য কেনাবেচা করেন, তার সবই ডাকদ্রব্য। বর্তমানে চিঠির জায়গা দখল করছে পার্সেল ও পণ্য পরিবহন। তাই এই কোর সার্ভিসকে ঘিরেই নতুনভাবে ডাক বিভাগের কার্যক্রম সাজানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিসের মতো উদ্যোগে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তেমনি ই-কমার্সের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন সেবা ও সুযোগ তৈরির মধ্য দিয়েই ডাক বিভাগ নতুন রূপে ফিরে আসবে।

উল্লেখ্য, ডাক বিভাগের সেবা সম্প্রসারণ ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি ও লেটার রাইটার মূলত একই কাজের দুটি ভিন্ন রূপ হিসেবে কাজ করবে। ডাক বিভাগের নাম ও ব্র্যান্ড ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠান চুক্তিবদ্ধ হয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় পণ্য সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্ব পালন করলে তা ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ হিসেবে পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তি এককভাবে বা নিজস্ব উদ্যোগে একই দায়িত্ব পালন করলে তাকে ‘লেটার রাইটার’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তার পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *