বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করতে ফ্রান্স প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত জিন-মার্ক সেরে-চারলেট। তিনি বলেছেন, শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বহুপক্ষীয় ও সহযোগিতার মতো অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।

মঙ্গলবার ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ডিক্যাবের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত সংগঠনটির দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিক্যাব বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি সংগঠনটির ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করেন।

বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় বেশি ‘বিশৃঙ্খল, বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত’ মন্তব্য করে ফ্রান্স রাষ্ট্রদূত বলেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের একটি সাধারণ উপায়ে পরিণত হয়েছে এবং সহযোগিতার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ব একটি গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বলপ্রয়োগের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

এ অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে তৎকালীন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুম্যান যে ধারণা সামনে এনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ইউরোপীয় একীকরণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউরোপীয় প্রকল্পটি ধীরগতির ও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে—এমন মত প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও দিয়েছেন। তবে তার মতে, ইউরোপীয় একীকরণের সামগ্রিক লক্ষ্য সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সহসভাপতিত্বে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে আয়োজিত একটি যৌথ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স এই সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়ামসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের একই ধরনের উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ফ্রান্স রাষ্ট্রদূত বলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করা, ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা।

বাংলাদেশকে ফ্রান্সের ‘দীর্ঘদিনের, নির্ভরযোগ্য ও অনুমানযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত বলেন, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, বহুপক্ষীয়তা এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে মূল্যবোধের মিল রয়েছে।

তিনি বলেন, ফ্রান্স একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সব ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আরব ও মুসলিমবিশ্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের অবস্থান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফ্রান্স একটি বহুপাক্ষিক ‘তৃতীয় পথ’ বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অংশীদার দেশগুলোকে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সহায়তা করাই ফরাসি নীতির অন্যতম লক্ষ্য। এতে কোনো দেশকে ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে না।

ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপরও গুরুত্ব দেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। অবৈধ মাছ ধরা, জলদস্যুতা ও পাচারের মতো অপ্রথাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের কথা জানান তিনি।

বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গতিশীল হলেও বাণিজ্যে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা রয়েছে বলেও জানান ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত।

তিনি বলেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সাড়ে চার বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে। তবে ফরাসি রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সের মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই টেক্সটাইল খাত—বিশেষ করে পোশাক ও পরিধেয় পণ্য—থেকে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া বিমান চলাচল, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। পরিবহন, জ্বালানি ও টেকসই নগর উন্নয়নে ফরাসি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ভবিষ্যতে ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জলবায়ু কূটনীতিতে ফ্রান্সের ভূমিকার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে ফ্রান্স পরিবেশগত সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে অভিযোজন, টেকসই অবকাঠামো ও দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরো জোরদারের কথাও জানান তিনি।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার তহবিলের ৮০ শতাংশের বেশি জলবায়ু সহনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে টেকসই অবকাঠামো ও সবুজ অভিযোজন উদ্যোগে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াতেও ফ্রান্স সহযোগিতা করছে বলেও জানান রাষ্ট্রদূত।

একই সঙ্গে নারীর অধিকার ও জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে ফ্রান্সের ‘নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি’র কথা তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০৩০ মেয়াদের কৌশলে শিক্ষা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং প্রজনন অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারীবাদী জলবায়ু পদক্ষেপ, ডিজিটাল অধিকার ও সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিকেও নতুন অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ফ্রান্স-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিন্ন মূল্যবোধ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে থাকা দেশগুলোর আরো সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ফ্রান্স বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরো জোরদার করতে প্রস্তুত। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু ভূ-রাজনীতি নয়, অর্থনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

এ সময় ‘ফ্রান্স-বাংলাদেশ সম্পর্কের দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

By Nasim

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *