আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন ভূখণ্ডে পরিণত করার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই বিস্ফোরক মন্তব্যের কড়া জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ‘পা ভেঙে দেওয়ার’ নজিরবিহীন হুমকি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে এই অঞ্চলে মার্কিন সেনাকে হত্যা বা বন্দি করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার বা ৫ বিলিয়ন তোমান আর্থিক পুরষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির শীর্ষ সামরিক বাহিনী।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এর এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের নতুন করে আর কোনো সংলাপে না বসার অবস্থানের পর দুই পরাশক্তির মধ্যে এই চরম কথার লড়াই মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে তৈরি করেছে নতুন তীব্র উত্তেজনা।

ঘটনার সূত্রপাত সম্প্রতি ট্রাম্পের দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার খ্যাত হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানকে চূড়ান্ত পরাজিত করার পর—যেটি খুব দ্রুতই ঘটতে যাচ্ছে—আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য বা ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘মূলত এখন এটি (হরমুজ প্রণালি) আমাদেরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমাদের অবরোধ কার্যকর আছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজ সেখান দিয়ে যেতে পারবে না।’

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানে মার্কিন হামলার আগে বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান জলপথ ছিল এই হরমুজ প্রণালি। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে এবং বহুবার এটি সম্পূর্ণ বন্ধও করে দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং শান্তিচুক্তির কোনো লক্ষণ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের জবাবে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দখলের মতো বিষয় নিয়ে রসিকতা করা একটি ‌“বিশাল ভুল”। কারণ, ইরানের এমন বীর রক্ষকরা রয়েছে যারা ট্রাম্পের “পা ভেঙে দেবে”।’ তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন বাহিনীকে এই অঞ্চল থেকে ‘কার্যকরভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’ এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের আর প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

মার্কিন প্রশাসনকে ‘পরাজয়ের বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার’ পরামর্শ দিয়ে হাতামি বলেন, সবাই জেনে রাখুক, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান ঘাঁটিগুলো আর কখনো তাদের আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে না। আমাদের প্রতিবেশী অঞ্চলে ইসলামি ইরানকে হুমকি দেওয়ার জন্য কোনো কেন্দ্র গড়ে তোলার অনুমতি আমরা কখনোই দেব না। আমেরিকানদের একমাত্র পথ হলো এই অঞ্চল ত্যাগ করা।’

উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বড় আর্থিক পুরস্কারের পরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন মেজর জেনারেল হাতামি। তিনি জানান, ‘আর্থিক জিহাদে’ অংশ নিতে আগ্রহী জনগণের সহযোগিতায় ও সেনাবাহিনীর গ্যারান্টিতে এই অর্থ দেওয়া হবে। হাতামি বলেন, ‘যে কেউ একজন আক্রমণকারী আমেরিকান সেনাকে হত্যা বা বন্দি করে তুলে দিতে পারবে, তাকে ৩০ হাজার ডলার সমপরিমাণ বা ৫ বিলিয়ন তোমান উপহার দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি এই কাজে সফল হবে, তার ব্যবহৃত অস্ত্রটি দ্বিগুণ দামে কিনে নেওয়া হবে এবং তাকে একটি নতুন অস্ত্র দেওয়া হবে। আর সেনার কাছ থেকে সংগৃহীত মূল অস্ত্রটি একটি বিশেষ জাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হবে।’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই গাজায় স্থবির হয়ে পড়া শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারে বিরল কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে গত রবিবার এক শীর্ষ হামাস নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। আজ সোমবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে কুশনারের। মার্কিন-সমর্থিত এই ১৫ দফা রোডম্যাপ অনুযায়ী, হামাসকে গাজায় অস্ত্রসংবরণ করতে হবে এবং ইসরায়েলকে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ১০ মাসেরও বেশি সময় পার হলেও অঞ্চলটি এখনো ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত বছর মিসরে কুশনার, স্টিভ উইটকফ ও হামাস নেতাদের বৈঠকের মাধ্যমে মূল যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলেও, হামাসের অস্ত্রহ্রাসের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দীর্ঘায়িত মতভেদের কারণে গাজার ২০ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আটকে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *