বিশেষ প্রতিবেদকঃ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তরকে (বিইআই) ঘিরে গত কয়েক বছরে বিপুল অর্থের অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন শ্রেণির বৈদ্যুতিক লাইসেন্স, উপকেন্দ্র অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সেবাকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে চারটি খাতে অবৈধভাবে আদায় করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা।

অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারীর নাম সামনে এলেও এর সঙ্গে দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে উপ-প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শক ও সদস্য সচিব (বিদ্যুৎ লাইসেন্সিং বোর্ড) প্রকৌশলী আতোয়ার রহমান মোল্লার ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

লাইসেন্সের আড়ালে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিপুলসংখ্যক লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পাশাপাশি আবেদনকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হতো। কোথাও সরাসরি, আবার কোথাও দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

কয়েকজন ভুক্তভোগীর ভাষ্য, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করে লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির মুখে পড়তে হতো। বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি হলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হতো।

মাঠকর্মী থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়—কারা নিয়ন্ত্রণ করতেন?

অভিযোগে বলা হয়েছে, অফিস সহকারী সাখাওয়াত বাবু এবং কম্পিউটার অপারেটর উইলিয়ামের মাধ্যমে লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্থ সংগ্রহ ও তথ্য সংরক্ষণের কাজ পরিচালিত হতো। বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি আবেদনকারী ও পরীক্ষার্থীদের তথ্য একটি আলাদা ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এত বড় পরিসরে একটি প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন চললেও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরের বাইরে থাকার বিষয়টি কতটা বাস্তবসম্মত। এ জায়গাতেই আতাউয়ার রহমান মোল্লার ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

প্রশ্নপত্র ও ভাইভা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

লাইসেন্স পাওয়ার পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন, উত্তর এবং মৌখিক পরীক্ষায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ছবি আগেই সরবরাহ করা হতো।

এতে যোগ্য প্রার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রকৌশলী আল-আমিন হোসেনের দাবি, তিনি ভাইভা বোর্ডের প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর দেওয়ার পরও অকৃতকার্য হন। অথচ তার পাশে থাকা একজন প্রার্থী কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়েও দালালের মাধ্যমে ‘এবিসি’ ক্যাটাগরির লাইসেন্স পেয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

চার খাতে বিপুল অর্থ আদায়ের হিসাব

নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে চারটি খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী—

প্রথমত, উপকেন্দ্র অনুমোদন:
প্রায় ১৭ হাজার ১৫১টি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফাইলপ্রতি ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গড় হিসাবে এ খাতে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ ৩৪৩ কোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ঠিকাদারি লাইসেন্স:
৫ হাজার ৪০৭টি লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে এ খাতে প্রায় ৩২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, সুপারভাইজার লাইসেন্স:
১১ হাজার ২৩৭টি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে মোট অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১২৪ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।

চতুর্থত, ইলেকট্রিশিয়ান লাইসেন্স:
৪৮ হাজার ১৫৩টি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৭২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সবগুলো খাত মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ও ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন।

সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির অভিযোগ

অভিযোগের আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, দপ্তরের তুলনামূলক কম বেতনভুক্ত কয়েকজন কর্মচারীর নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাখাওয়াত বাবুর নামে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের জমি এবং বাঘারপাড়ায় উইলিয়ামের নামে বহুতল ভবনের তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের সঙ্গে তাদের বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আতোয়ার রহমান মোল্লার নামে বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ঢাকা ও নিজ এলাকায় ফ্ল্যাট, প্লটসহ অন্যান্য সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবিও উঠেছে।

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অর্থ, পরে কুরিয়ারে লাইসেন্স

অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহারও ছিল। আবেদনকারীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে অর্থ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে লাইসেন্স কুরিয়ার বা অন্য মাধ্যমে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনের তথ্য, ফোনকলের রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ এবং দপ্তরের কম্পিউটার ডাটাবেজ পরীক্ষা করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বদলি ও নথি সরানোর অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মচারীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসার পর তাদের দায়িত্ব পরিবর্তন বা অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট নথি, ডাটাবেজ ও যোগাযোগের তথ্য নষ্ট বা পরিবর্তনের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের বদলি আদেশ, অফিস আদেশ, কম্পিউটার লগ, সার্ভার ডাটা এবং নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও তদন্তের দাবি

অভিযোগের একটি অংশে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন এবং এর বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন, সম্পদের বিবরণ, ফোন যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট দুই রাজনৈতিক নেতার কাছে কোনো অর্থ পৌঁছেছে কি না, তারও তদন্ত প্রয়োজন।

তদন্তে নথি ও ডিজিটাল তথ্য যাচাইয়ের দাবি

অভিযোগগুলোকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভিজিল্যান্স শাখার তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে আতোয়ার রহমান মোল্লার স্বাক্ষর করা অনুমোদন ফাইল, লাইসেন্সের ডাটাবেজ, আবেদনকারীদের তালিকা, পরীক্ষার ফলাফল, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এ ছাড়া কথিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকা বার্তা, ফাইল আদান-প্রদান ও অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগ সংরক্ষণ করে ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বচ্ছ তদন্তের জন্য যেসব পদক্ষেপ জরুরি

অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা বের করতে সংশ্লিষ্টদের মতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, গত পাঁচ বছরে দেওয়া সব ধরনের লাইসেন্স ও অনুমোদনের পূর্ণাঙ্গ অডিট করা। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত সরকারি ফি এবং বাস্তবে আদায় করা অর্থের তুলনামূলক হিসাব তৈরি করা। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের বিবরণ যাচাই করা।

একই সঙ্গে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন পরীক্ষা, প্রয়োজন হলে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নেওয়া এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সহজ হবে।

লাইসেন্স পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, ভাইভা বোর্ডের কার্যক্রম এবং ফলাফল প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়া সিসিটিভি ও ডিজিটাল রেকর্ডের আওতায় আনারও দাবি রয়েছে। ভবিষ্যতে সরাসরি যোগাযোগ ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কমিয়ে স্বচ্ছ অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পরামর্শও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আতোয়ার রহমান মোল্লার বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে উপ-প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শক প্রকৌশলী আতোয়ার রহমান মোল্লার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *