আন্তর্জাতিক ডেস্ক : কাস্পিয়ান সাগরে সম্প্রতি একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের ভয়াবহ ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্য-পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধকে একসূত্রে গেঁথে ফেলার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। গত ২৫ জুলাই ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কেবল এক তরুণ নাবিকের প্রাণই কেড়ে নেয়নি বরং ইরান-ইউক্রেন সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বহির্বিশ্বের জন্য শঙ্কার বিষয় হলো, এর মাধ্যমে সংঘাতের সীমান্ত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরেই সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে।

নিহত ওই তরুণ ইরানি নাবিকের নাম নিমা মোরাদি, যার বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। উত্তর ইরানের বন্দর নগরী বান্দারে আনজালি থেকে আসা নিমার শৈশব থেকেই ইচ্ছা ছিল নাবিক হওয়ার। আয়রন আকরিক বোঝাই ‘আনা’ নামক জাহাজে রাশিয়া থেকে ইরানে ফেরার পথে ইউক্রেনীয় দূরপাল্লার ড্রোনের আঘাতে নিমা নিহত হন এবং জাহাজের আরও এক কর্মী গুরুতর আহত হন। নিমার এই অকাল প্রয়াণে তার পরিবার ও পুরো ইরানি সমাজ আজ গভীর শোকে নিমজ্জিত।

ঘটনার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইউক্রেনের এই পদক্ষেপ জাতিসংঘের সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি অভিযোগ তোলেন, ইসরায়েলের উসকানিতেই ইউরোপকে যুদ্ধের দিকে টেনে আনতে এই আঘাত হানা হয়েছে। অন্যদিকে এই হামলা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে তেল আবিব, যা এই ঘটনার পেছনে থাকা ভূ-রাজনৈতিক চাল নিয়ে সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রথমে ইরান এই হামলার কঠোর সামরিক জবাব দেয়ার পরিকল্পনা হিসেবে ইউক্রেনের তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে খবর পাওয়া যায়। তবে পরবর্তীতে কিয়েভের পক্ষ থেকে দুঃখপ্রকাশ করায় এবং তেহরানের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই নীরবতা বা নমনীয়তা একেবারে স্থায়ী কিছু নয় বরং তেহরান এখন নতুন কোনো ফাঁদে না পড়ার জন্য সময় নিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতকে একীভূত করার একটি কৌশলগত চেষ্টা করা হচ্ছে। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া ও ইরানকে একই অক্ষের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। তাছাড়া, ওয়াশিংটনের নজর ও সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বেশি চলে যাওয়ায় কিয়েভ একধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই ইরানকে এই সংঘাতে টেনে আনলে আমেরিকার সমর্থন ইউক্রেনের দিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে বলে ইউক্রেনীয় নীতি নির্ধারকরা চিন্তা করছেন।

ইউক্রেনীয় এই কৌশলের মাধ্যমে ইসরায়েলও সরাসরি লাভবান হতে পারে। এর ফলে মার্কিন-ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে তার ভাবমূর্তির সংকট কাটিয়ে উঠতে এই যুদ্ধকে নিজেদের সুরক্ষার বদলে ইউক্রেনকে রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক সুবর্ণ সুযোগ পাবে।

ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক সবসময় সহজ ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি এবং বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক টানাপোড়েনে দুটি দেশ পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পরও মস্কো ও তেহরানের নীতিগত দূরত্ব বজায় ছিল। তবে সময় ও দূরদর্শী রাজনীতির প্রয়োজনে তা পরবর্তীতে কৌশলগত ও সামরিক অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। যৌথ প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর তাগিদ আজ রাশিয়া ও ইরানকে এক ছাতার নিচে এনে দাঁড় করিয়েছে।

কাস্পিয়ান সাগরের মতো সুরক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনস্থ একটি অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এক মারাত্মক সতর্কবার্তা। এই পানিপথটি কেবল একটি সীমান্ত বা রুট নয় বরং রাশিয়া ও ইরানের জন্য বিশ্ব নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইউক্রেনীয় এই হামলার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বৈশ্বিক অস্থিরতার মানচিত্র প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পানিপথ ও ভূখণ্ডে ডালপালা মেলে প্রসারিত হচ্ছে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে বিশ্বব্যবস্থার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *