# দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ক্রয়সংক্রান্ত ইউনিটে অবস্থান # সরকারি অর্থে ধারাবাহিক বিদেশ সফর ও প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ # ২০২৩ সালে বিদেশ সফরে ‘নিজের নাম নিজেই’ পাঠানোর অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) কাজী মো. ফিরোজ হাসানের দীর্ঘ চাকরিজীবন ঘিরে যেন প্রশ্নের শেষ নেই। প্রায় ২৮ বছরের চাকরিতে দীর্ঘ সময় ঢাকাকেন্দ্রিক দায়িত্ব, গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ইউনিটে প্রায় ১৭ বছরের অবস্থান, সরকারি অর্থায়নে একাধিক দেশে ধারাবাহিক বিদেশ সফর এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের পোস্টিং ও বিদেশ সফরসংক্রান্ত নথির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর কর্মজীবনের বড় একটি সময় তিনি ঢাকায় কাটিয়েছেন। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর পেকু-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে পিপিসি বিভাগেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে পিপিসি ও পেকু মিলিয়ে প্রায় ১৭ বছর একই ধরনের ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায়। অন্যদিকে সরকারি নথিতে মালয়েশিয়া, জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়াসহ ১৭টি দেশে প্রশিক্ষণ ও সরকারি সফরের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন নথির হিসাবে সফরের সংখ্যা ২৫টির কাছাকাছি বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে কাজী ফিরোজ হাসানের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি এতগুলো প্রশিক্ষণে যাননি এবং গণপূর্তে তার চেয়েও বেশি বিদেশ সফর করেছেন—এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন। ফলে প্রশ্ন এখন একটাই—সরকারি নথি ও কর্মকর্তার বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য কোনটি ? চাকরির প্রায় পুরো সময় ঢাকায়, পেকুতেই দীর্ঘ অধ্যায় : নথি অনুযায়ী, কাজী মো. ফিরোজ হাসান ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ স্টাফ অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। দেড় মাসের মাথায়, ১৬ মার্চ, তাকে সাভার গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়। ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকার পিপিসি বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন।
এরপর একই বিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের নভেম্বরে মাত্র প্রায় এক মাসের জন্য নেত্রকোনা গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ২৪ ডিসেম্বর ২০০৯-এ ফের ঢাকায় পেকু বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের অধ্যায়। নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পেকু সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) হিসেবেও দায়িত্ব পান। অর্থাৎ প্রায় ১৬ বছর একই পেকু কাঠামোর সঙ্গে এবং আগের পিপিসি-পেকু সংশ্লিষ্ট দায়িত্বসহ প্রায় ১৭ বছর একই ধরনের ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠছে। গণপূর্তের অভ্যন্তরে এ কারণেই সহকর্মীদের একটি অংশের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘পেকু ফিরোজ’ নামে। গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে এত দীর্ঘ সময়—প্রশ্ন বদলি নীতিতেও গণপূর্তের পেকু বিভাগ ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ সময় একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই বদলি নীতি, প্রশাসনিক ভারসাম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন সামনে আনে।
সহকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কাঠামোয় থাকার কারণে তার প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কাজী ফিরোজ হাসান বলেছেন, তিনি মূলত বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন এবং নিয়মিত ‘ওয়ার্কিং’ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পগুলোর এসব কাজ ছিল ‘নন-প্রফিটেবল’। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—একজন কর্মকর্তাকে একই গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাঠামোয় এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের অনুমোদন কে দিয়েছেন, কী যুক্তিতে দিয়েছেন এবং প্রচলিত বদলি নীতির সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল ? ১৭ দেশে সরকারি সফর—প্রশিক্ষণ, সফর ও ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব কোথায় ? কাজী ফিরোজ হাসানের বিদেশ সফরের তালিকাও কম চমকপ্রদ নয়।
২০০৯ সালের জুনে মালয়েশিয়ায় ‘ফ্যাসিলিটি মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে বিদেশ সফরের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। ১৪ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে তিনি সেখানে প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এরপর তালিকায় যুক্ত হয় জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়া। নথিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী— ২০১২ সালে জাপানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট প্রশিক্ষণ; ২০১৫ সালে মিসরে মেরিন টেকনোলজি; একই বছরে ইতালিতে ভোকেশনাল এডুকেশন; ডেনমার্কে অকুপেশনাল সেফটি; ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরে লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট; ২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডসে মেরিন টেকনোলজি; ২০১৮ সালে রাশিয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সফর; ২০১৯ সালে স্পেনে সেফটি ডিভাইস কোয়ালিটি; ভারতে রবীন্দ্রনাথ গ্যালারি; তুরস্কে ‘Panorama 1453’; বেলজিয়ামে জেনোসাইড মিউজিয়াম; ২০২১ সালে গ্রিসে সেন্টেনিয়াল স্কুল; ২০২২ সালে ফিনল্যান্ডে লিফট পারফরম্যান্স; ২০২৫ সালে বুলগেরিয়ায় ওয়াটার ফাউন্টেনসংক্রান্ত সফর। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারি অর্থে এসব সফরের প্রতিটির মোট ব্যয় কত ছিল, কী প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন হয়েছে, একই ধরনের প্রশিক্ষণে অন্য কর্মকর্তাদের সুযোগ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সফর শেষে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে গণপূর্তের কাজে কতটা প্রয়োগ হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে কতটা স্বচ্ছ? রাশিয়া সফরের নথিতেও অস্বাভাবিক তারিখ বিদেশ সফরসংক্রান্ত নথিতে রাশিয়া সফরের সময়কাল ১৯ জুন ২০১৮ থেকে ২৫ জুন ২০২৮ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের বর্তমান সময়ের তুলনায় ২০২৮ সাল ভবিষ্যৎ হওয়ায় নথির এই তারিখে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। এটি নিছক টাইপিং বা নথি প্রস্তুতের ভুল, নাকি তথ্য সংরক্ষণে অন্য কোনো সমস্যা—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার কথা ছিল, বিমানবন্দর থেকেই ফেরত : চলতি বছর সেন্ট্রাল এসি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার কথা ছিল কাজী ফিরোজ হাসানের। তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি ওই সফরে যেতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও স্পষ্ট—সরকারি নথিতে প্রস্তাবিত সফর, অনুমোদন, মনোনয়ন, ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত সফর বাতিল হওয়ার বিষয়টি কি যথাযথভাবে হিসাব ও নথিতে প্রতিফলিত হয়েছে ? ২০২৩ সালের বিদেশ সফর নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ : কাজী ফিরোজ হাসানকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ২০২৩ সালের একটি বিদেশ সফরের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগ রয়েছে, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি বিদেশ সফরের জন্য প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তিনি নিজের নাম নিজেই মনোনয়ন দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা বিদেশ সফরের জন্য মনোনীত হলে প্রথমে সংস্থাপনের মাধ্যমে ফাইলে নোট উপস্থাপন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে সংস্থাপনের দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর স্বাক্ষরে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর কথা। অভিযোগ হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাজী ফিরোজ হাসান সরাসরি নিজের নাম এবং তৎকালীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ-এর নাম সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার এবং তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও তখন আলোচনায় আসে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
ঘটনাটি নিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ/ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয় এবং সে যাত্রায় সংশ্লিষ্টরা পার পেয়ে যান—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। এই অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্নটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের নয়; এটি সরকারি মনোনয়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ‘ওয়ার্কিং’ অভিজ্ঞতা নিয়ে সহকর্মীদের প্রশ্ন : কাজী ফিরোজ হাসানের দীর্ঘ কর্মজীবন নিয়েও সহকর্মীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘ সময় মূল ‘ওয়ার্কিং’ বিভাগে দায়িত্ব পালন না করায় মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রকৌশল ও নির্মাণকাজের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের সীমাবদ্ধতা আড়াল করতে বিভিন্ন সময় তিনি ওয়ার্কিং বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলতেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ এবং প্রমাণ এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘আমলনামা’ তৈরির অভিযোগ : ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাজী ফিরোজ হাসান একটি রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি গণপূর্তের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য বা কথিত ‘আমলনামা’ গোপনে সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছে দেওয়া এবং পরে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে—এমন দাবিও রয়েছে। কর্মকর্তাদের পদায়নে লটারির পদ্ধতি চালুর পেছনেও তার ভূমিকা ছিল—এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও নথিভিত্তিক তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
প্রশ্নের মুখে ‘পেকু ফিরোজ’ অধ্যায় : সব অভিযোগ ও নথির তথ্য পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে— এক. একজন কর্মকর্তা কীভাবে প্রায় ১৬ বছর একই গুরুত্বপূর্ণ পেকু কাঠামোয় দায়িত্ব পালন করলেন ? দুই. দীর্ঘদিন একই ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ইউনিটে অবস্থানের ক্ষেত্রে বদলি নীতির ব্যতিক্রম হয়েছিল কি না ? তিন. ১৭টি দেশে সরকারি অর্থায়নে সফর বা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রকৃত সংখ্যা কত ? চার. প্রতিটি সফরের পেছনে সরকারি ব্যয় কত ? পাঁচ. কারা তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন এবং মনোনয়নের মানদণ্ড কী ছিল ? ছয়. ২০২৩ সালের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সফরের ক্ষেত্রে নিজের নাম নিজে পাঠানোর অভিযোগ সত্য কি না ? সাত. সে ঘটনায় মন্ত্রণালয় কেন ব্যাখ্যা চেয়েছিল এবং পরবর্তীতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ? আট. বিদেশ প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান গণপূর্তের কাজে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ? নয়. রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের কোনো লিখিত প্রমাণ আছে কি না ? দশ. বদলি-পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি না? এখন প্রয়োজন নথিনির্ভর স্বাধীন তদন্ত : বিদেশে সরকারি প্রশিক্ষণে যাওয়া কোনোভাবেই নিজে অনিয়মের প্রমাণ নয়। বরং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত উন্নয়নের স্বীকৃত মাধ্যম।
একইভাবে দীর্ঘদিন একটি প্রকল্পে কাজ করাও সবসময় অপরাধ বা অনিয়ম নয়। কিন্তু যখন একই কর্মকর্তাকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, ধারাবাহিক সরকারি বিদেশ সফর, মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের দাবি—সবগুলো বিষয় একই সঙ্গে সামনে আসে, তখন নীরবতার সুযোগ থাকে না। গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সততা বা দক্ষতার দাবি যেমন যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তার দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক বৈধতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও হতে হবে স্বচ্ছ। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—কাজী ফিরোজ হাসানের বিদেশ সফরের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস, প্রতিটি সফরের অনুমোদন ও মনোনয়ন ফাইল, সরকারি ব্যয়ের হিসাব, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী প্রতিবেদন, দীর্ঘমেয়াদি পেকু পদায়নের প্রশাসনিক অনুমোদন এবং ২০২৩ সালের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট ঘটনার নথি প্রকাশ্যে এনে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা। কারণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি কাজী ফিরোজ হাসানকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ, সরকারি অর্থ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহারে নিয়ম কি সবার জন্য সমান, নাকি প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা কোনো অদৃশ্য দরজা খোলা থাকে ? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরের অনেক কর্মকর্তা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ রবিন মিয়া
নির্বাহী সম্পাদকঃ ইরিন তৃষ্ণা
ফোন নাম্বারঃ 01937643838
ফোন নাম্বারঃ 01772666086
Email: News@doinikalokbarta.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: সেকশন-৬, ব্লক-ক লেইন-১, বাড়ি - ২০/১ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2025 All rights reserved দৈনিক আলোক বার্তা