
নুসরাত জাহানঃ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওরে চলতি মৌসুমে জলচর পাখির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি আগের বছরগুলোর মতো পাখি শিকার, বিষটোপ ব্যবহার কিংবা নিষিদ্ধ জালে আটকে পাখি মারা যাওয়ার ঘটনা এবার প্রায় দেখা যায়নি। বিষয়টি জানিয়েছেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। তাঁর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি দল গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি হাওরের ৪৩টি বিলে পাখিশুমারি চালায়।
এই শুমারির আয়োজন করে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন। এতে সহযোগিতা করে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, সিলেট। শুমারিতে অংশ নেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম, বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু, সহসভাপতি জেনিফার আজমেরি, সদস্য অণু তারেকসহ আরও অনেকে।
শুমারির ফলাফল সম্পর্কে সরওয়ার আলম দীপু জানান, এ বছর হাকালুকি হাওরে মোট ৫৩ প্রজাতির ৫৪ হাজার ৪৮৬টি জলচর পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৮টি প্রজাতি স্থানীয় এবং ৩৫টি প্রজাতি পরিযায়ী পাখি। গত বছর এখানে ৬০ প্রজাতির মাত্র ৩৫ হাজার ২৬৮টি পাখি পাওয়া গিয়েছিল। সেই তুলনায় এবার পাখির সংখ্যা বেশ বেড়েছে। তাঁর মতে, হাওরের চিনাউরা ও হাওরখালসহ কয়েকটি বিলে এবার পরিবেশ তুলনামূলক ভালো ছিল এবং সেখানে পানি বেশি ছিল। অন্য অনেক স্থানে পানি কমে যাওয়ায় অনেক পাখি এসব বিলে এসে জমায়েত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বছর হাওরের নাগুয়া-লরিবাই বিল এলাকায় পাখি শিকারের জন্য প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল পাওয়া গিয়েছিল। সেই জালে আটকে টিমেঙ্কের চাপাখি নামের বিরল দুটি পাখির মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পিংলা বিলের পাশে ‘কার্বোটাফ’ নামের এক ধরনের শক্তিশালী রাসায়নিক কীটনাশকের প্যাকেটও পাওয়া যায়। শিকারিরা ধানের সঙ্গে এই বিষ মিশিয়ে বিলের আশপাশে ছিটিয়ে রাখত। পাখিরা খাবার ভেবে সেই ধান খেয়ে বিষক্রিয়ায় মারা যেত। তবে এবারের শুমারিতে এমন কোনো জাল বা বিষটোপের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সরওয়ার আলম দীপু মনে করেন, স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর কারণে শিকারিদের তৎপরতা কমে থাকতে পারে।
এবারের শুমারিতে একটি অত্যন্ত বিরল প্রজাতির পাখি—সাদা কপাল রাজহাঁস—দেখা গেছে। বাংলাদেশে এই পাখি সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছরে একবার দেখা যায়। এছাড়া প্রথমবারের মতো হাওরে একসঙ্গে ১৯৪টি রাজহাঁস দেখা গেছে, যা দেশের জন্যও একটি বিরল ঘটনা।
এ বছর উপকূলীয় অঞ্চলে সাধারণত দেখা যায় এমন কিছু সৈকতপ্রিয় পাখির সংখ্যাও হাওরে বেশি পাওয়া গেছে। লালপা, গুলিন্দা ও জৌরালিসহ বিভিন্ন প্রজাতির সৈকতপাখি মিলিয়ে প্রায় সাত হাজারের বেশি পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে শুধু জৌরালি পাখির সংখ্যাই প্রায় সাড়ে তিন হাজার।
হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে আছে। প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর আয়তনের এই হাওরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৩৮টি বিল রয়েছে। ১৯৯৯ সালে সরকার এই হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
তবে সামগ্রিকভাবে পাখির সংখ্যা আগের তুলনায় কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরে সারা দেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে। হাকালুকি হাওরের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। ২০০০ সালের আগে এখানে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার পাখি দেখা যেত।
পূর্বের পাখিশুমারির তথ্যেও ওঠানামা দেখা যায়। ২০২৩ সালে এখানে ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮টি, ২০২২ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৬ হাজার ৫০১টি, ২০২১ সালে ৪৫ প্রজাতির ২৪ হাজার ৫৫১টি, ২০২০ সালে ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি, ২০১৯ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৯৩১টি, ২০১৮ সালে ৪৪ প্রজাতির ৪৫ হাজার ১০০টি এবং ২০১৭ সালে ৫০ প্রজাতির ৫৮ হাজার ২৮১টি জলচর পাখি দেখা গিয়েছিল। ২০২৪ সালে সেখানে কোনো শুমারি হয়নি।
পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ইনাম আল হক বলেন, শুধু হাকালুকি হাওর নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই কয়েক বছর ধরে পাখির সংখ্যা কমছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে অনেক জলাভূমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে বা মানুষের দখলে চলে যাচ্ছে। ফলে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল কমে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হাওর এলাকায় কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব পড়ছে জলজ পরিবেশের ওপর। কীটনাশকের কারণে ফড়িংসহ বিভিন্ন পোকামাকড় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো মাছের প্রধান খাদ্য। এতে মাছের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে এবং পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। হাওরের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ রবিন মিয়া
নির্বাহী সম্পাদকঃ ইরিন তৃষ্ণা
ফোন নাম্বারঃ 01937643838
ফোন নাম্বারঃ 01772666086
Email: News@doinikalokbarta.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: সেকশন-৬, ব্লক-ক লেইন-১, বাড়ি - ২০/১ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2025 All rights reserved দৈনিক আলোক বার্তা