বিশেষ প্রতিবেদকঃ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব প্রদানের আইনগত বৈধতা নিয়ে মামলা বিচারাধীন। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নির্দেশও দিয়েছেন। এর মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল/মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগের তিন প্রকৌশলীকে উচ্চতর পদে নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাদের নিয়োগের বৈধতা, ক্যাডার স্ট্যাটাস, বিভাগীয় পরীক্ষা ও পদোন্নতির যোগ্যতা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আগেই বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি—ডিপিসির মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার তৎপরতার অভিযোগও রয়েছে।
আরও গুরুতর বিষয় হলো, তিন প্রকৌশলীর একজন মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে পৃথক অভিযোগের তদন্তের জন্য সরকারি নথিতে তদন্ত কমিটির সভার তথ্য রয়েছে। অথচ অভিযোগকারীদের দাবি, জাহাঙ্গীর আলমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন, কারণ দর্শানোর নোটিশ বা দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একইভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সরোয়ার আলম এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ যাচাইয়ে কার্যকর তদন্ত কেন হচ্ছে না—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একদিকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে একই বিষয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উচ্চতর পদে নেওয়ার প্রশাসনিক উদ্যোগ যদি সত্যিই চলতে থাকে, তাহলে সেই উদ্যোগের আইনগত ভিত্তি কী ?
ট্রাইব্যুনালের শোকজের মধ্যেই ডিপিসির তৎপরতা ?
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১, ঢাকায় দায়ের করা এ.টি. মামলা নং-২৭৯/২০২৬—Md. Abdul Halim and 09 others বনাম Secretary, Ministry of Housing & Public Works and others মামলাটি গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে বিবাদীদের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করেছেন।
মামলার আদেশ অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখের একটি স্মারক এবং তার ভিত্তিতে গ্রেড-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর আইনগত কর্তৃত্ব নিয়ে কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। মামলার পরবর্তী সার্ভিস রিটার্নের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর ২০২৬।
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৮০-এর ৪ ধারায় প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের চাকরির শর্ত ও তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নির্ধারিত হয়েছে। একই আইনের ৭ ধারায় ট্রাইব্যুনালকে নথি তলব ও সরকারি রেকর্ড চাওয়ার মতো দেওয়ানি আদালতের কিছু ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
অতএব, বিচারাধীন বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ চলতে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি, নথিভুক্ত সিদ্ধান্ত এবং ট্রাইব্যুনালের আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য—সবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে শুধু মামলা বিচারাধীন থাকলেই প্রত্যেক প্রশাসনিক পদক্ষেপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তও আইনের সাধারণ কাঠামো থেকে টানা যায় না। নির্দিষ্টভাবে ট্রাইব্যুনালের আদেশে কোনো স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।

যে স্মারক ঘিরে মূল বিরোধ : মামলার নথি অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে স্মারক নং ২৫.০৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২ জারি করা হয়।
ওই স্মারকে মত দেওয়া হয়, Bangladesh Civil Service (Examination for Promotion) Rules, 2017 গ্রেড-৬-এর সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম)-দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গ্রেড-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়।
এখানেই মামলার মূল আইনগত প্রশ্ন। বাদীপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীরা ক্যাডার সার্ভিসে এনক্যাডারভুক্ত নন। ফলে Bangladesh Civil Service Recruitment Rules, 1981 এবং Bangladesh Civil Service (Examination for Promotion) Rules, 1986, যা ২০১৭ সালে সংশোধিত হয়েছে—এসব বিধির আওতায় তারা কীভাবে ক্যাডারের গ্রেড-৪ পদে পদোন্নতির যোগ্য হন, সেটিই নির্ধারণযোগ্য প্রশ্ন।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৮ ধারাও বলছে, পদোন্নতি শুধু প্রশাসনিক পছন্দের বিষয় নয়; সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরির বিষয় বিবেচনার পাশাপাশি পদোন্নতির শর্ত সংশ্লিষ্ট বিধি দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে। ফলে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বিশেষকে পদোন্নতি দেওয়া উচিত কি না—এমন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, কোন বিধির অধীনে, কোন সার্ভিস স্ট্যাটাসে এবং কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গ্রেড-৪ পদে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে ?
আদালতের প্রশ্নের মধ্যেই ‘চলতি দায়িত্বের’ প্রস্তাব :
সরকারি নথিতে আরও দেখা যায়, এর আগেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্মারক নং ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-১৩৫৭-এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। নথি অনুযায়ী, রিজার্ভসহ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর অনুমোদিত পদ ১১টি। এর মধ্যে সাতটি পদে নিয়মিত কর্মকর্তা কর্মরত ছিলেন। বিভিন্ন কারণে চারটি পদ শূন্য হওয়ার পর একটি পদে পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানো হয়। এরপরও তিনটি পদ শূন্য থাকায় ‘সরকারি কাজের স্বার্থে’ জরুরি ভিত্তিতে তিনজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
প্রস্তাবিত কর্মকর্তারা হলেন—
মো. জিয়াউর রহমান—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন বিভাগ-১, ঢাকা। প্রস্তাবিত দায়িত্ব—ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২। মো. জাহাঙ্গীর আলম—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), রিজার্ভ, গণপূর্ত অধিদপ্তর; সংযুক্ত—গণপূর্ত ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ। প্রস্তাবিত দায়িত্ব—চট্টগ্রাম গণপূর্ত ই/এম সার্কেল। মো. তাসফিন মুহাইমীন হক—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম প্ল্যানিং বিভাগ-৩। প্রস্তাবিত দায়িত্ব—রাজশাহী গণপূর্ত ই/এম সার্কেল। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লব।
তদন্তের নথি আছে, তবু জাহাঙ্গীরকে উচ্চতর দায়িত্বের প্রস্তাব কেন ?
তিন কর্মকর্তার মধ্যে মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে পৃথক অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকার তথ্য সরকারি নথিতে রয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অধিশাখার স্মারক নং ২৫.০০.০০০০.০০০.১০২.৩১.০০৬.২৬-১৭-এর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগ তদন্তে কমিটির সভা আহ্বান করা হয়। নথিতে ৫ মার্চ ২০২৬-এর স্মারক নং ২৫.০০.০০০০.১৩০.২৭.০০৩.২৪-১৭৮ এবং ২০ জুন ২০২৬-এর স্মারক নং ২৫.৩৬.০০০০.০০০.২২০.২৭.০০২৩.২৬.২১০-এর উল্লেখ রয়েছে। ৯ জুলাই ২০২৬ সকাল ১১টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে তদন্ত কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ নথির ভাষ্য অনুযায়ী, একদিকে একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া রয়েছে, অন্যদিকে তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
এখানে প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন, প্রশ্ন গুলো যথাক্রমে, তদন্তাধীন অভিযোগটি কি চলতি দায়িত্বের ফাইলে উল্লেখ করা হয়েছিল ? তদন্তের বিষয়টি ডিপিসির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি ? কোনো শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা প্রস্তাবিত বা চলমান থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি ? তদন্ত কমিটির সর্বশেষ অবস্থান কী ? তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই উচ্চতর দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কোন বিধি অনুসরণ করেছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী বলা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না—সেটিও প্রশ্নের বাইরে রাখা যায় না।
সরোয়ার আলম-বিপ্লবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন : এদিকে তিন প্রকৌশলীকে ঘিরে পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সরোয়ার আলম এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে ২৬ অক্টোবর ২০২৫-এর চলতি দায়িত্বের প্রস্তাবে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি নথিতে রয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও পদোন্নতি নিয়ে একাধিক অভিযোগ প্রকাশের পরও মো. সরোয়ার আলম ও মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাইয়ে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি এবং কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়নি। তবে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন—এটিই মূল বিষয়। তদন্ত না করে অভিযোগকে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি তদন্ত ছাড়াই অভিযোগগুলোকে অগ্রাহ্য করাও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
‘কোটি টাকার প্যাকেজ’—অভিযোগ আছে, প্রমাণের প্রশ্নও আছে : তিন প্রকৌশলীর পদোন্নতি ঘিরে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিশেষ করে মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে ডিপিসি-সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য অর্থ লেনদেনের কথাও মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে আলোচিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান-ফল বা আদালতের রায় এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। ফলে অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
কিন্তু অভিযোগ যদি নথিভুক্তভাবে উত্থাপিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—কর্তৃপক্ষ সেটি যাচাই করেছে কি না। সরকারি পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য হলে সেটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; সম্ভাব্য দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ও হতে পারে। তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথি, আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ফাইল নোট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের দাবি উঠতেই পারে।
নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে নতুন সংকটের আশঙ্কা : বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়মিত বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি যেখানে জ্যেষ্ঠতা, বিভাগীয় পরীক্ষা, প্রযোজ্য বিধি এবং অন্যান্য যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখানে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একই ক্যাডারের উচ্চতর পদে নেওয়া হলে ভবিষ্যতে জ্যেষ্ঠতা ও ক্যাডার কাঠামো নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ ও চাকরির শর্ত আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণের কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে। আর সংবিধানের ১১৭ অনুচ্ছেদে চাকরির শর্তসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে মূল বিষয় ব্যক্তি নয়; মূল বিষয় হলো সার্ভিস স্ট্যাটাস, নিয়োগের বৈধতা, প্রযোজ্য বিধি, জ্যেষ্ঠতা এবং পদোন্নতির আইনগত ভিত্তি।
মন্ত্রণালয় এতদিন নীরব কেন ? ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান পূর্ণাঙ্গ তদন্তের উদ্যোগ দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে । প্রশ্ন হলো, অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়, তাহলে নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা হচ্ছে না কেন ? আর অভিযোগের কোনো অংশ সত্য হলে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
বিশেষ করে মো. সরোয়ার আলম, মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লব এবং মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে যেসব অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে অন্তত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নও এখন উঠছে। কারণ তদন্ত কমিটি গঠন মানেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। বরং অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাই তদন্তের স্বাভাবিক উদ্দেশ্য।
মন্ত্রণালয়ের কাছে সরাসরি প্রশ্ন : এ অবস্থায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত—প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১-এর এ.টি. মামলা নং ২৭৯/২০২৬ এবং ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর স্মারক নং এ.টি-১/৩১২/২০২৬ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের ফাইল বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে ? ৩ মার্চ ২০২৬-এর স্মারক নং ২৫.০৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২ কোন আইন ও বিধির ভিত্তিতে জারি করা হয়েছে ? সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোন নির্দিষ্ট বিধির অধীনে ক্যাডারের গ্রেড-৪ পদে পদোন্নতির যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন ?
২৬ অক্টোবর ২০২৫-এর স্মারক নং ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-১৩৫৭-এর চলতি দায়িত্বের প্রস্তাব তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট নিয়োগ, ক্যাডার স্ট্যাটাস ও পদোন্নতির আইনগত প্রশ্নগুলো যাচাই করা হয়েছিল কি ? মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সরকারি নথিতে উল্লেখিত তদন্তের বিষয়টি তার চলতি দায়িত্ব বা পদোন্নতির ফাইলে উল্লেখ করা হয়েছিল কি ?
তদন্ত কমিটির ৯ জুলাই ২০২৬-এর সভার পর তদন্তের অগ্রগতি কী ? ডিপিসির ফাইল প্রস্তুতের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়োগের বৈধতা, বিভাগীয় পরীক্ষা, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা, জ্যেষ্ঠতা এবং ক্যাডার স্ট্যাটাস যাচাই করা হয়েছে কি ? ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন একই বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি কী ? পদোন্নতি ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ যাচাইয়ে কোনো প্রশাসনিক তদন্ত বা দুর্নীতিবিরোধী অনুসন্ধান হয়েছে কি ? একাধিক অভিযোগ প্রকাশের পরও মো. সরোয়ার আলম, মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লব ও মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাইয়ে কোনো তদন্ত কমিটি বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি কেন ?
এখন প্রয়োজন নথি খুলে তদন্ত : গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকৌশল সংস্থা। এখানে একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত সরকারি প্রশাসনের শৃঙ্খলা, জ্যেষ্ঠতা, ক্যাডার কাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা।
তাই প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন বিষয়, ৩ মার্চের বিতর্কিত স্মারক, ২৬ অক্টোবরের চলতি দায়িত্বের প্রস্তাব, তিন কর্মকর্তাকে ঘিরে ডিপিসির তৎপরতার অভিযোগ, মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে তদন্তের নথি এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—সবগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একই নথিপুঞ্জের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সার্ভিস রেকর্ড, নিয়োগপত্র, ক্যাডার স্ট্যাটাস, জ্যেষ্ঠতার তালিকা, বিভাগীয় ও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষার তথ্য, ডিপিসির কার্যবিবরণী, ফাইল নোট, চলমান তদন্তের নথি এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের আদেশ—এসব একসঙ্গে পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে । সবচেয়ে বড় কথা, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত । এখন দেখার বিষয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নথি খুলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, নাকি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন প্রশ্ন এবং সরকারি নথিতে থাকা তদন্ত-তথ্যের মধ্যেই বিতর্কিত পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
কারণ প্রশ্নটি এখন শুধু তিন প্রকৌশলীর পদোন্নতির নয়—প্রশ্ন উঠেছে গণপূর্তের ই/এম বিভাগের পদোন্নতি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আইনগত ভিত্তি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ রবিন মিয়া
নির্বাহী সম্পাদকঃ ইরিন তৃষ্ণা
ফোন নাম্বারঃ 01937643838
ফোন নাম্বারঃ 01772666086
Email: News@doinikalokbarta.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: সেকশন-৬, ব্লক-ক লেইন-১, বাড়ি - ২০/১ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2025 All rights reserved দৈনিক আলোক বার্তা