নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সমুদ্রপৃষ্ঠের বহু নিচে থাকা রহস্যময় এক জগতকে ঘিরে এখন বাড়ছে মানুষের আগ্রহ আর বিনিয়োগ। ব্যাটারি ও শিল্পের কাঁচামাল জোগাড়ের নামে গভীর সমুদ্রে খনি খনন নিয়ে বিজ্ঞানীরা যখন সতর্ক করছেন তখনই নতুন করে সামনে এসেছে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের চিত্র। অজানা এই পরিবেশে মানুষের হস্তক্ষেপ ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে তা নিয়েই উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

বিশ্বের ২০টিরও বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গভীর সমুদ্রে খনি খননে অর্থায়ন না করার অঙ্গীকার করলেও জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে ডিপ সি মাইনিং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে অন্তত ৬৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিনিয়োগ রয়েছে।

ব্যাটারি ও শিল্পখাতে ব্যবহৃত নিকেল কোবাল্ট তামার সন্ধানে সমুদ্রপৃষ্ঠের হাজার হাজার মিটার নিচে খননকাজ চলছে। অথচ এই পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। এখন পর্যন্ত সমুদ্রতলের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক শতাংশ অংশ অন্বেষণ করা সম্ভব হয়েছে।

গ্রিনপিসের ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের নথি বিশ্লেষণ করে ডয়চে ভেলে জানিয়েছে এই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে ডয়েচে ব্যাংক, ইউবিএস, ক্রেডিট সুইস, ক্রেডিট এগ্রিকোল। এসব বিনিয়োগের তথ্য সামনে এসেছে এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র গভীর সমুদ্রে খননকে ভবিষ্যতের খনিজ উৎস হিসেবে এগিয়ে নিতে চাইছে। বিপরীতে প্রায় ৪০টি দেশ এই কার্যক্রম স্থগিতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী দিভা আমন বলেন গভীর সমুদ্র অত্যন্ত সংবেদনশীল অথচ মানবজাতির জন্য অপরিহার্য। আমরা যা ধ্বংস করতে যাচ্ছি সে সম্পর্কে আমাদের ন্যূনতম ধারণাও নেই এবং একবার হারালে তা আর ফেরানো যাবে না।

ডয়েচে ব্যাংক ও ক্রেডিট এগ্রিকোল দাবি করেছে তাদের অঙ্গীকার নির্দিষ্ট প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে সমালোচকদের মতে এভাবে বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া আসলে গ্রিনওয়াশিংয়ের শামিল।

গ্রিনপিসের সাবেক ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট মাউরিসিও ভার্গাস বলেন পরিবেশগত বিতর্ক এড়াতেই ব্যাংকগুলো এমন কৌশল নেয়। অন্যদিকে নরওয়ের স্টোরব্র্যান্ড গ্রুপ গভীর সমুদ্রে খনি খননের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে সতর্কতামূলক নীতির দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে।

ডয়চে ভেলের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে জনগণের করের টাকা এমনকি পেনশন তহবিলও এই খাতের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন পলিমেটালিক নোডুলস অপসারণ করলে কয়েক মিলিয়ন বছরের জন্য পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

জাতিসংঘের সমুদ্রবিষয়ক বিশেষ দূত পিটার থমসন গভীর সমুদ্রে খনি খননে অন্তত ১০ বছরের স্থগিতাদেশের আহ্বান জানিয়েছেন। পরীক্ষামূলক খননের প্রাথমিক ফলাফলেও দেখা গেছে সমুদ্রতলের প্রাণবৈচিত্র্য এক তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে।

দিভা আমনের ভাষায় গভীর সমুদ্র সম্পর্কে মানুষ যদি আরও জানত তবে সেখানে খনি খননের কথা ভাবত না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *