
এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার আদালত মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে জড়িত ১০৩ জন সিন্ডিকেট সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাতিল করেছেন। আদালত রবিবার এই মামলার পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চকে (ডিবি), যাতে সত্যি তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের নামে মানুষের শোষণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে পল্টন থানায় আফিয়া ওভারসিজের মালিক আলতাফ খান ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, সিআইডি প্রতিবেদন প্রায়ই পক্ষপাতমূলক এবং মনগড়া ছিল। আলতাফ খান জানান, “আসামিদের প্রভাবের কারণে সিআইডি সত্য উদঘাটন না করে পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। আদালতের এ আদেশ সুবিচারের পথ খুলে দিয়েছে।”
মানবপাচারবিরোধী সংগঠনগুলোও আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা আশাবাদী যে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে সিন্ডিকেটচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। সিআইডি তদন্তে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার আগে সরকারের একজন বিশেষ সহকারীর তদবিরে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটার রুহুল আমীন (স্বপন), আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটার বেনজীর আহমেদ, সিংঙা ওভারসিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান নিজাম হাজারি, ইস্পপেরিয়াল রিসোর্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্ময়দ মাহবুবুর রহমান, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর রফিকুল ইসলাম, যেজি আলফালা ম্যানেজম্যান্টের প্রোপাইটর মোহাম্মদ সোহেল রানা, অপরাজিতা ওভারসীজের আরিফুর রহমান, ট্রান্স এশিয়া ইন্টেগ্রেড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল আবু জাহেদ, ইউনাটেড এক্সপোর্ট লিমিটেডের পরিচালক এস এম রফিক, কিউ কে কুইক এক্সপ্রেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিন, নাতাশা ওভারসীজের প্রোপাইটর মোহাম্মাদ নাজিবুর রহমানসহ আরও অনেক ব্যক্তি।
মালয়েশিয়ায় সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত দুজন ব্যবসায়ী—আমিনুল ইসলাম ও রুহুল আমিন স্বপন—কে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফেরানোর জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা ভুক্তভোগী কর্মীদের কাছ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন এবং তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
২০২২ সালের আগস্টে প্রায় ছয় বছর পর মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো পুনরায় শুরু হলেও ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার অনুমতিপ্রাপ্ত কর্মী যেতে পারেননি। সরকার প্রায় ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমতি দিয়েছিল, যেগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিত। সিন্ডিকেটের বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী রুহুল আমিন স্বপন, আর মালয়েশিয়ার অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন আমিনুল ইসলাম আবদুন নুর। প্রত্যেক কর্মীর অভিবাসন ব্যয় সরকারিভাবে ৭৯ হাজার টাকা হলেও বাস্তবে গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা নেওয়া হত।
একই সময়, নাফিসা কামালের মালিকানাধীন অরবিটালস ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে সিআইডি নতুন মামলা করেছে। তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্তরা সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রায় ৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
গত বছরের ২০ অক্টোবর ইমরান আহমেদকে বনানী থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। রিমান্ডে তিনি স্বীকার করেছেন যে সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর নামে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল, যেখানে তিনি নিজেও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেননি।
