বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সব অভিযোগ সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব, মন্ত্রী-সংশ্লিষ্ট লবিং এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এই সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প লুটপাট, টেন্ডার বাণিজ্য, নদী দখল, উচ্ছেদ বাণিজ্য ও বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম আলোচিত সদস্য হিসেবে উঠে এসেছে বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর ও পরিবহন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন ওরফে “আরিফ হাসনাত”-এর নাম। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। পাশাপাশি ড্রেজিং বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছাইদুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম তালুকদার এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মজনু মিয়ার বিরুদ্ধেও একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে রয়েছে।
দুদকের তাগিদপত্রে আরিফ উদ্দিনের দুর্নীতির অনুসন্ধান :
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়, সেগুনবাগিচা, ঢাকার স্মারক নং- ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩.৩২৩১৭, তারিখ ২৩/০৯/২০২৩ খ্রিস্টাব্দ অনুযায়ী উপ-পরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে টিম লিডার করে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। ওই অনুসন্ধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়— “জনাব আরিফ হাসনাত, যুগ্ম পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ”। দুদকের চাহিদাপত্রে নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাট পোর্টের ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের হিসাব, সরকারি কোষাগারে জমা সংক্রান্ত ডিপোজিট স্লিপ, ব্যাংক হিসাবের বিবরণ, আরিফ উদ্দিনের ব্যক্তিগত নথি, বেতন-ভাতার তথ্য এবং তার নিজ, স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা বা শেয়ার পরিচালনার নথিপত্র চাওয়া হয়।
জাতীয় পরিচয়পত্রে যে তথ্য উঠে এলো : নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র তথ্য অনুযায়ী এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৫৫০৮৪৫৪৯০৬। তার জন্ম ১ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে পাবনায়। পিতা আব্দুল করিম এবং স্ত্রী কাজী শামীমা সুলতানা। স্থায়ী ঠিকানা পাবনার সুজানগরের রাইপুর ক্ষেতুপাড়া এলাকায় হলেও বর্তমানে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বিলাসবহুল আবাসনে বসবাস করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির আড়ালে তিনি ঢাকার বসুন্ধরা, বারিধারা, পূর্বাচল, গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্লক-সি, রোড-১ এর প্লট নং-৫৪, ৫৫ ও ৫৬-এ তার তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আহমেদ আকবর সোবহানের বাড়ির উত্তর পাশেও তার একটি প্লট রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
‘পল্টিবাজ আরিফ’: ছাত্রদল থেকে আওয়ামী লীগের দাপুটে সুবিধাভোগী : বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে আরিফ উদ্দিন “পল্টিবাজ আরিফ” নামেই বেশি পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রজীবনে বিএনপির ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজেকে কট্টর আওয়ামী লীগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি।
শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে তুরাগ নদীতে নৌকা বাইচ আয়োজন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবার নিজেকে “সাচ্চা বিএনপি” পরিচয়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নদী উচ্ছেদের নামে চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্য : অভিযোগ অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীতে অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে অন্তত ৫০ কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন আরিফ উদ্দিন। নিরীহ ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়, বৈধ ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধ স্থাপনা অক্ষত রাখার মতো ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পুরান ঢাকার ইসলামবাগ এলাকায় ১৮টি বৈধ ভবন ভাঙচুরের ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ভবনপ্রতি লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হলেও টাকা না দেওয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
নারায়ণগঞ্জে আলিনা ডকইয়ার্ড ও মুন্সি ডকইয়ার্ড উচ্ছেদ করে কর্ণফুলী ডকইয়ার্ডকে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার অভিযোগেও উচ্চ আদালতে রিট হয়েছিল। পরে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে গোপন সমঝোতা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মসজিদ ভাঙা, লঞ্চ মাস্টারকে মারধর, প্রশাসনিক সন্ত্রাস :
২০১৮ সালের ৫ আগস্ট সদরঘাটে বায়তুল নাজাত মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায়ও আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের কাছে চাঁদা দাবি এবং তা না পেয়ে হামলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একটি পিকনিক লঞ্চে অভিযান চালিয়ে লঞ্চ মাস্টারকে মারধর, সেনা কর্মকর্তা ও সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপমান করার ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত হয়। তবে রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
ড্রেজিং প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার লুটপাট :
বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আরেকটি ভয়ংকর সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম তালুকদার, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছাইদুর রহমান ও মজনু মিয়া। অভিযোগ রয়েছে, ৩৫ ড্রেজার ক্রয় ও আনুষঙ্গিক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পসহ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নিম্নমানের দেশীয় ড্রেজার সরবরাহ করা হয়। এলসি খুলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পূর্ণভবা নদী খনন প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, কাগজে-কলমে ড্রেজিং দেখিয়ে বাস্তবে নদীতে কাজই হয়নি।
ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে
জীবিত বাবাকে মৃত দেখানোর অভিযোগ : ড্রেজিং বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা এড়াতে জীবিত বাবাকে মৃত দেখিয়ে সম্পদ গোপনের অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মজনু মিয়ার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচারে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ :
বরিশাল ড্রেজার বেইজের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মজনু মিয়া ড্রেজার মেরামত, জ্বালানি ক্রয় ও স্থানান্তরের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অন্তত ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধান থেমে যাওয়ার অভিযোগ : অভিযোগকারীদের দাবি, দুদকে একাধিক অনুসন্ধান চললেও রহস্যজনক কারণে তদন্ত ধীরগতিতে চলছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক লবিংয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তরা মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বিআইডব্লিউটিএ’র এই বহুমাত্রিক দুর্নীতি, টেন্ডার সিন্ডিকেট, নদী দখল ও রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে দেশের অন্যতম বড় দুর্নীতির জাল উন্মোচিত হতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ রবিন মিয়া
নির্বাহী সম্পাদকঃ ইরিন তৃষ্ণা
ফোন নাম্বারঃ 01937643838
ফোন নাম্বারঃ 01772666086
Email: News@doinikalokbarta.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: সেকশন-৬, ব্লক-ক লেইন-১, বাড়ি - ২০/১ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2025 All rights reserved দৈনিক আলোক বার্তা