বিশেষ প্রতিবেদক: গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৫ যেন এখন এক অঘোষিত “দুর্নীতির দুর্গ”। আর সেই দুর্গের কথিত নিয়ন্ত্রক নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেন—যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে তামজীদ হোসেন ছিলেন কার্যত “অপ্রতিরোধ্য”।
চাকরির শুরু থেকেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়লেও তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও কমেনি তার দাপট; বরং আগের মতোই প্রভাব খাটিয়ে তিনি এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

দুদকে জমা পড়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মির্জা আজমের প্রভাবে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা সৈয়দ তামজীদ হোসেন। এই সিন্ডিকেট বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, তদবির এবং কমিশন আদায়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর মদদে পুরো সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে এবং তামজীদের দপ্তর থেকেই চলছে বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের নেপথ্য কারসাজি।
অভিযোগ আরও ভয়ংকর। সরকারি ইজিপি (e-GP) ও আইবাস (iBAS++)-এর মতো স্পর্শকাতর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নাকি চলে গেছে বহিরাগতদের হাতে! অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেনের ব্যক্তিগত আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অফিসে বসেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ওয়ার্ক অর্ডার আপলোড, বিল এন্ট্রি এবং আর্থিক নথি প্রক্রিয়াকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন “মিঠু” নামের এক আউটসোর্সিং কর্মচারী। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এসব দায়িত্ব পালনের কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হিসাব শাখাকে কার্যত অকার্যকর করে পুরো আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কুক্ষিগত করেছেন তামজীদ। তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত মিঠুই দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। চট্টগ্রামে কর্মরত থাকাকালেও একইভাবে মিঠুকে ব্যবহার করেছেন তিনি। পরে ঢাকায় বদলি হয়ে আসার সময় তাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন।
গণপূর্তের ভেতরে এখন প্রকাশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে আরেক নাম—দেলোয়ার হোসেন ভুট্টো। অভিযোগ রয়েছে, এই কথিত ঠিকাদারের মাধ্যমে বিভাগটির অধিকাংশ লাভজনক কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন তামজীদ হোসেন। এসি, লিফট, সাবস্টেশন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহে নির্দিষ্ট দোকান ও কোম্পানি “প্রেসক্রাইব” করে দেওয়া হয়। ফলে ঠিকাদাররা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে মালামাল কিনছেন, আর কমিশনের মোটা অংশ চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার বিল বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হলেও সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের বিল অস্বাভাবিক দ্রুততায় পরিশোধ করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ধাপেই প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার বিল ছাড় করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এমনকি গত অর্থবছরের প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজ নতুন অর্থবছরের এপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে সিন্ডিকেটকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বিভাগজুড়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী “লুটপাট চক্র”—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক ঠিকাদার ও কর্মকর্তা। নির্বাহী প্রকৌশলীর পাশাপাশি কয়েকজন এসডিই, বহিরাগত ব্যক্তি ও প্রভাবশালী ঠিকাদার এই সিন্ডিকেটে সক্রিয় বলে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে এক নারী এসডিই’র বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও কমিশন আদায়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, “পার্সেন্টেজ” ছাড়া কোনো ফাইলই নড়ে না।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের “ম্যানেজ” করার কথা বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। এমনকি দুই সাংবাদিকের নাম ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেনের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ঘুরেফিরে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতেই যাচ্ছে। ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং পুরো বিভাগ পরিণত হয়েছে একটি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট অর্থনীতিতে।
গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে বিভাগের ১০ জন কর্মচারী বহিরাগতদের দিয়ে অফিস পরিচালনার প্রতিবাদ জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তারা অফিসের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানালেও অভিযোগের পর উল্টো ভয়ভীতি ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তামজীদ হোসেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে তিনি প্লট, ফ্ল্যাট, গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেন। তার দাবি, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ রবিন মিয়া
নির্বাহী সম্পাদকঃ ইরিন তৃষ্ণা
ফোন নাম্বারঃ 01937643838
ফোন নাম্বারঃ 01772666086
Email: News@doinikalokbarta.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়: সেকশন-৬, ব্লক-ক লেইন-১, বাড়ি - ২০/১ মিরপুর, ঢাকা-১২১৬
Copyright © 2025 All rights reserved দৈনিক আলোক বার্তা