নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গরিবদের স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেওয়া প্রকল্পে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। পাঁচ বছরের এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর এক মাসও নেই, কিন্তু কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৭ শতাংশ। যা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অনিয়ম আর নিম্নমানের কাজের জালে জড়ানো।

প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকায় পাবলিক টয়লেট, ল্যাট্রিন ও ছোট পানির স্কিম নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন এখন ভাঙাচোরা, বন্ধ বা সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক জায়গায় নির্মাণকাজে প্রকৌশল স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি। মাটির নিচে নির্ধারিত গভীরতায় পাইপ বসানো হয়নি, টাইলস নষ্ট, ফিটিংস চুরি হয়ে গেছে, আর পানিতে অস্বাভাবিক আয়রন—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।

সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা ৪৭টি পানির স্কিমের মধ্যে মাত্র ৪টিতে নিয়ম মেনে কাজ হয়েছে। পাবলিক টয়লেটের ৮০ শতাংশ এখন ব্যবহারযোগ্য নয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য নির্মিত ১৯টি টয়লেটের মধ্যে ১৭টিই বন্ধ বা ভাঙা।

এদিকে এই প্রকল্পের মূল নিয়ন্ত্রক—প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে তিনি প্রকল্পের বিল নিজের ইচ্ছেমতো পাশ করেছেন বলে জানা গেছে। এমনকি বিল পরিশোধের চেকেও একমাত্র তারই সই থাকত, ফলে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা কার্যত কিছুই করতে পারতেন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রকল্পের অর্থ দিয়ে তবিবুর রহমান দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সিরাজগঞ্জ শহরে মায়ের নামে ছয়তলা ভবন, ধানমন্ডিতে ৫ হাজার স্কয়ারফুটের বাণিজ্যিক ফ্লোর, আরও দুটি ফ্ল্যাট এবং ব্যাংককেও একটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। একাধিক গাড়ি তো আছেই, পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে নানা বিতর্ক। অভিযোগ আছে, তিনি ছয়টি বিয়ে করেছেন এবং প্রতিটি স্ত্রীর জন্য আলাদা বাড়িও তৈরি করেছেন।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো—এই তবিবুর রহমানকেই আবার নতুন করে ১,৮৮৯ কোটি টাকার আরেকটি স্যানিটেশন প্রকল্পের পিডি করা হয়েছে, সেটিও বিশ্বব্যাংকের অর্থে। এতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনার ঝড়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বলেন, “আইএমইডির প্রতিবেদনটি আমার হাতে আসেনি, তবে বিষয়টি দেখে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ফোনে কিছু বলব না, দেখা হলে কথা বলা যাবে।”

সূত্র বলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করছে, যদিও তবিবুর প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ আছে।

গরিবের টয়লেট ও পানি সরবরাহের নামে এমন লুটপাট কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, সাধারণ মানুষের প্রতি এক নির্মম তামাশাও বটে। উন্নয়নের নাম ভাঙিয়ে যারা এভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *