
জয়পুরহাট প্রতিনিধিঃ জয়পুরহাটে আমন ধানের ক্ষেতে পোকা দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ‘পার্চিং’ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি, গাছের ডাল বা ধইঞ্চার ডাল পুঁতে দেওয়া হয়, যেখানে বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি বসে ক্ষতিকারক পোকা ও তাদের ডিম খেয়ে ফেলে। ফলে কীটনাশক ছাড়াই ধানক্ষেত পোকামুক্ত থাকে এবং উৎপাদন বেড়ে যায়।
কৃষকেরা বলছেন, এটি একদিকে খরচ কমানো ও লাভজনক, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত একটি উপায় হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জেলার গ্রামীণ অঞ্চলে।
ডেড ও লাইভ পার্চিং
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্চিং পদ্ধতি দুই প্রকার—ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। শুকনো গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দিলে তা ডেড পার্চিং, আর জীবন্ত ধইঞ্চার ডাল পুঁতে দিলে তা লাইভ পার্চিং হিসেবে পরিচিত।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৬ থেকে ৮টি বাঁশের কঞ্চি, ডাল ও ধইঞ্চার ডাল পুঁতে দিচ্ছেন। এসব পার্চে শালিক, ফিঙে ও বুলবুলি পাখি বসে ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে। এতে কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
কৃষকদের অভিজ্ঞতা
হিচমী বাজারের কৃষক নুরুল ইসলাম, কড়ই মাদ্রাসা গ্রামের লাবু মিয়া, ধারকী গ্রামের দেলোয়ার হোসেন এবং কোমরগ্রামের আতোয়ার হোসেন জানান, এবার তাদের জমিতে আমন ধানের চারাগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সবুজ ও সতেজ।
নুরুল ইসলাম বলেন, “আগে পোকা দমনে নিয়মিত কীটনাশক ব্যবহার করতাম। এখন পাখিরাই পোকা খেয়ে দিচ্ছে। এতে খরচ কমছে, ধানও ভালো হচ্ছে।”
বটতলী গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, “পার্চিং পদ্ধতির ফলে ফসল উৎপাদনের খরচ অনেক কমেছে, আর কীটনাশক প্রায় লাগছেই না। এতে আমরা উপকার পাচ্ছি।”
কৃষি বিভাগের পরামর্শ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাদিকুল ইসলাম বলেন, “পোকা দমনে কেবল কীটনাশকের ওপর নির্ভর করলে খরচ বেড়ে যায় এবং পরিবেশের ক্ষতি হয়। পার্চিং পদ্ধতি কৃষকদের খরচ কমাচ্ছে, আবার বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও পরিবেশ সুরক্ষিত থাকছে।”
তিনি আরও জানান, “জমিতে পাখির বিষ্ঠা পড়ায় তা জৈব সার হিসেবে কাজ করছে, ফলে মাটির উর্বরতাও বাড়ছে।”
৭২ হাজার হেক্টরের ৪০ হাজারেই পার্চিং
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাট জেলায় ৭২ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে কৃষকেরা পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
কৃষিবিদরা মনে করছেন, এই পদ্ধতি জয়পুরহাটের কৃষিক্ষেত্রে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
