বিশেষ প্রতিবেদকঃ নোয়াখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ে রোববার দীর্ঘ সময় ধরে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পানি সরবরাহ ও নলকূপ স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ সরকারি মালামাল গোপনে নামমাত্র দামে নিলাম দেওয়ার অভিযোগ তুলে একদল ঠিকাদার কার্যালয়টি ঘেরাও করেন। এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম প্রায় ছয় ঘণ্টা নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এই ঘটনায় পুরো কার্যালয়ের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, জেলা কার্যালয়ের গুদামে মজুত থাকা সাত থেকে আট কোটি টাকা মূল্যের পাইপ, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ম না মেনে অত্যন্ত কম দামে নিলাম দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্বাচনী ব্যস্ততা ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের ঘনিষ্ঠ ও পছন্দের লোকদের কাছে এসব মালামাল বিক্রি করার ব্যবস্থা করেন। এতে প্রকৃত ঠিকাদারেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বিকেলের দিকে কার্যালয়ে উপস্থিত শতাধিক ঠিকাদার ও তাঁদের সহযোগীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। কার্যালয়ের ভেতরেও কয়েকজন ঠিকাদার ঢুকে পড়েন এবং সেখানে মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে তাঁদের তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

জেলা বিএনপির সদস্য ও ঠিকাদার আবদুল মোতালেব ওরফে আপেল অভিযোগ করেন, শুধু মালামাল নিলাম নয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে নির্বাহী প্রকৌশলী গত কয়েক মাসে তাঁর কাছ থেকে এবং অন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকেও প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আদায় করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ পেতে হলে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে অনেক ঠিকাদার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন এবং বাধ্য হয়েই তাঁরা কার্যালয় ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচিতে নামেন।

ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, সরকারি বিধি অনুযায়ী নিলামের আগে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, দরপত্র ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। সবকিছু গোপনে করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি লাভবান হন এবং সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের শামিল বলেও তাঁরা দাবি করেন।

অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, গুদামের মালামালের নিলাম জেলা কার্যালয় থেকে নয়, ঢাকার ঊর্ধ্বতন দপ্তর থেকে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দাবি, যেসব ঠিকাদার কাজ পাননি, তাঁরাই ক্ষোভ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। তবে পরিস্থিতি শান্ত করতে ঠিকাদারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিলামের কার্যাদেশ বাতিল করার আশ্বাস দেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত নিলাম বাতিলের আশ্বাস পেয়ে বিকেল পাঁচটার দিকে ঠিকাদারেরা কার্যালয় থেকে সরে যান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হন। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে নোয়াখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে সামনে এলো। সংশ্লিষ্ট মহলে এখন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *