নুসরাত জাহানঃ পয়লা ফাল্গুন এলেই আমার ভেতরটা কেমন যেন দুলে ওঠে। মনে হয়, শীতের ধূসর ক্লান্তি মুছে কোথা থেকে এক অদৃশ্য হাত এসে জানালার পাল্লা খুলে দিয়েছে। বাতাসে হালকা উষ্ণতার ছোঁয়া, মাটির সোঁদা গন্ধ, আর অকারণ এক ভালো লাগা—এই নিয়েই যেন বসন্তের শুরু।

সকালে বাইরে বেরিয়ে দেখি, প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি শীত ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। কোথাও কুয়াশার স্মৃতি, কোথাও হিমেল হাওয়া। তবু আজকের দিনটা আলাদা। মনে হয়, অদৃশ্য কোনো বাঁশি বাজছে—‘বসন্ত এসে গেছে’। কবিগুরুর গান অকারণেই মনে ভেসে ওঠে, দখিন দুয়ার খুলে বসন্তকে ডাকতে ইচ্ছে করে। আবার কখনো মনে পড়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই উচ্চারণ—ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত। সত্যিই তো, সব ফুল না ফুটলেও, মন তো ফুটছে!

চারপাশে তাকালে দেখি, গাছের ডালে ডালে কচি পাতার আভাস। শীতের ক্লান্তিতে বিবর্ণ হয়ে থাকা জারুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া—সবাই যেন প্রস্তুত হচ্ছে রঙে রঙে ভরে উঠতে। আম্রমুকুলের গন্ধ হালকা ভেসে আসে। মনে হয়, প্রকৃতি নিঃশব্দে সাজছে, একটু পরেই রঙের বিস্ফোরণ ঘটবে।

বসন্ত আমার কাছে শুধু ফুলের ঋতু নয়, অনুভূতিরও ঋতু। এই সময়টায় মন অকারণেই উচাটন হয়। হঠাৎ কাউকে খুব আপন মনে হয়, কারও পাশে দাঁড়ালেই ভালো লাগে। কচি পাতায় আলোর নাচন যেমন চোখে লাগে, তেমনি তরুণ হৃদয়ে লাগে দোলা। মনে হয়, জীবন আবার নতুন করে শুরু করা যায়।

কিন্তু বসন্ত মানেই শুধু প্রেম নয়—এ ঋতু আমাদের ইতিহাসও মনে করিয়ে দেয়। একুশের রক্তঝরা স্মৃতি, ভাষার জন্য আত্মত্যাগ—সবই তো এই সময়ের। বসন্তের রঙের সঙ্গে মিশে আছে সংগ্রামের রঙও। তাই বসন্ত এলে আমার মনে হয়, এ শুধু প্রকৃতির জাগরণ নয়, জাতিরও জাগরণ।

শহরের ব্যস্ত, যান্ত্রিক জীবনে হয়তো বসন্তের আবেশ আগের মতো তীব্র নয়। তবু আজ পয়লা ফাল্গুনে ঢাকার পথে পথে অনুষ্ঠান হবে, রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণীরা বের হবে, কোকিল ডাকবে পাতার আড়াল থেকে। আর আমি মনে মনে গুনগুন করে উঠব—মনেতে ফাগুন এলো।

বসন্ত আমার কাছে একসঙ্গে প্রেম আর প্রতিবাদের ঋতু। একটুখানি ছোঁয়া, একটুখানি কথা—এই দিয়েই আমি নিজের ভেতরে রচনা করি আমার ফাল্গুন। তাই আজও মনে হয়, যত ক্লান্তিই থাকুক, যত অনিশ্চয়তাই থাকুক—বসন্ত এলে জীবনকে আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *